মৌসুমি ফ্লু যেভাবে বড় বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে
- আপডেট সময় : ০৮:৩২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

সামান্য ফ্লু হয়েছিল, বাড়িতে প্যারাসিটামল, পর্যাপ্ত তরল আর বিশ্রামই ছিল চিকিৎসা—এমনটাই পরামর্শ ছিল চিকিৎসকের। কিন্তু সেই ফ্লু থেকেই নিউমোনিয়া, তারপর সেপসিস, পুরো শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আইসিইউতে ২৪ দিন লড়াই করে মারা যান ওই বয়স্ক নারী। এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, ফ্লু কি আসলেই ‘সামান্য’ বিষয়, নাকি এটি কারও জীবনে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে?
মৌসুম পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে শীতের শুরু বা শেষে সর্দি, হাঁচি, কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা ও জ্বর নিয়ে ফ্লুর প্রকোপ দেখা দেয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে হওয়া এই অসুখ আমাদের কাছে পরিচিত। সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিন জ্বর ও সর্দি-কাশিতে ভুগে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে যান, তাই একে নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ফ্লু ভাইরাসের প্রাণসংহারী ভূমিকাও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ থেকে সাড়ে ছয় লাখ রোগী ফ্লুজনিত জটিলতায় প্রাণ হারান।
ফ্লু নিজে রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়, বিশেষ করে ফুসফুসের প্রতিরোধকে নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলে। রোগীর যদি আগে থেকেই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল থাকে, তবে এই ফ্লু থেকেই নিউমোনিয়া হতে পারে। ভাইরাল নিউমোনিয়ার পাশাপাশি ফুসফুসের প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাইরে থেকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণও হতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে সেপসিসের মতো প্রাণসংহারী জটিলতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কে এনকেফালাইটিস বা হার্টের প্রদাহের (মায়োকার্ডাইটিস) মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। হাঁপানি বা সিওপিডির মতো ফুসফুসের রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে ফ্লু থেকে শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, যা রেসপিরেটরি ফেইলিউর হয়ে আইসিইউ পর্যন্ত গড়াতে পারে।
সব রোগীর ক্ষেত্রে এমন জটিলতা হয় না, তবে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ঝুঁকি বেশি। শিশু, বৃদ্ধ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, হাঁপানি, সিওপিডি, হার্ট বা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগী, অতি স্থূল ব্যক্তি এবং ক্যানসার আক্রান্তদের ক্ষেত্রে ফ্লুর ঝুঁকি বেশি। গর্ভাবস্থায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে বলে গর্ভবতী নারীদেরও সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া কিছু ওষুধ রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়, এমন ব্যক্তিদেরও সাধারণ ফ্লুতে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সাধারণ সর্দি-কাশি বা জ্বরে আতঙ্কিত হয়ে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ ভাইরাস সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। তবে জ্বর অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে, কাশি বা শ্বাসকষ্ট অতিরিক্ত বাড়লে, দুর্বলতা, বমি, অজ্ঞান হওয়া, অসংলগ্ন আচরণ বা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। ফ্লু সেরে যাওয়ার সময় আবার নতুন করে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, প্রচণ্ড কাশি বা শ্বাসকষ্ট হওয়া সেকেন্ডারি ইনফেকশন বা নিউমোনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। শিশুদের শ্বাসকষ্টের ক্ষেত্রে বুকের ওঠানামা ও দেবে যাওয়া এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া খারাপ লক্ষণ।
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে অসুস্থতার সময় রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে বা কমে যেতে পারে, তাই নিজে নিজে ওষুধ বা ইনসুলিন বন্ধ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এ সময় পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া জরুরি। জ্বরের সময় বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন; জ্বর নিয়ে শিশুদের স্কুলে বা বড়দের বাইরে কাজ করা ঝুঁকি বাড়ায়।
মৌসুম পরিবর্তনের সময় শহর থেকে গ্রাম—সবখানে ফ্লুর প্রকোপ বাড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ভিড়ের জায়গা, মেলা, বাজার, গণপরিবহন বা নেমন্তন্ন এড়িয়ে চলাই ভালো। বাইরে মাস্ক ব্যবহার করা, ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং হাঁচি-কাশির আদবকেতা মেনে চলা জরুরি। ফ্লু আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার্য বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বছরওয়ারি ফ্লু ভাইরাস থেকে বাঁচতে টিকার বিকল্প নেই। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের দিকে মাংসপেশিতে ফ্লুর টিকা নেওয়া জটিলতা থেকে মুক্ত থাকার অন্যতম কার্যকর উপায়, বিশেষ করে বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের এ সময় ফ্লুর টিকা নেওয়া উচিত।লেখক: অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ.অতিরিক্ত চিন্তা থামানোর কৌশল ‘৬:৩০ নিয়ম’




























