২৮০ টাকার সাইকেলে ৬০ বছর ধরে পথ চলছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সামাদ
- আপডেট সময় : ০৮:৪৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক আবদুস সামাদ প্রামাণিক (৭৭)। এলাকার মানুষ তাঁকে চেনেন 'সামাদ প্রফেসর' নামে। প্রতিদিন সকাল-বিকেল তাঁকে রাস্তায় দেখা যায় সোজা হয়ে বসে সতেজ চোখে ধীরগতিতে বাইসাইকেলের প্যাডেল ঘোরাতে। তবে তিনি যে সাধারণ কোনো সাইকেলে চড়েন না, তা অনেকেই জানেন। প্রায় ৬০ বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট সাইকেলই তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। ১৯৬৬ সালে মাত্র ২৮০ টাকায় কেনা ইংল্যান্ডের 'র্যালি' ব্র্যান্ডের সেই সাইকেলটি আজও সচল এবং নিয়মিত ব্যবহার করছেন তিনি।
১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া সামাদ প্রামাণিকের পরিবার তাঁকে ১৯৬৬ সালে এই সাইকেলটি কিনে দিয়েছিল। ১৯৬৯ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে এই সাইকেলে চেপেই তিনি রাজশাহী শহরে যান। এরপর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ডাক এলে প্রিয় সাইকেলটি বাড়িতে রেখে রণক্ষেত্রে যোগ দেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাড়ি ফিরে দেখেন চারপাশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও তাঁর ভালোবাসার সাইকেলটি অক্ষত রয়েছে। সেই সাইকেল নিয়েই তিনি আবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান এবং ১৯৭৩ সালে সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবনে প্রবেশ করার পরও সাইকেলটি তাঁর পাশেই ছিল। ১৯৭৭ সালে ভবানীগঞ্জ কলেজে গ্রন্থাগারিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর ১৯৮৪ সালে সমাজকর্ম বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন সামাদ প্রামাণিক। প্রতিদিন বাড়ি থেকে কলেজে যাতায়াতের প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ তিনি এই সাইকেলেই পাড়ি দিতেন। এমনকি ২০০৯ সালে তাঁর অবসরের শেষ দিনটিতেও তিনি সাইকেল চালিয়েই কলেজে গিয়েছিলেন। অবসরের পরও তাঁর এই যাত্রা থামেনি। এখনো প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার সাইকেল চালান তিনি। সকালে ভবানীগঞ্জ উপজেলা বন বিভাগের কার্যালয়ের সামনে সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া থেকে শুরু করে বিকেলের নানা কাজ—সবখানেই তাঁর সঙ্গী এই 'র্যালি' সাইকেল।
দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে সাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কয়েকবার পরিবর্তন করতে হয়েছে। সামাদ প্রামাণিক জানান, তিনি সবসময় র্যালির নিজস্ব যন্ত্রাংশ লাগানোর চেষ্টা করতেন। তবে একপর্যায়ে সেসব আর না পাওয়ায় বর্তমানে ভালো মানের অন্য যন্ত্রাংশ ও টিউব ব্যবহার করছেন। নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার রহস্য জানিয়ে তিনি বলেন, 'বাইসাইকেল চালাতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। এই বয়সেও যে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ আছি, এর বড় অবদান নিয়মিত সাইকেল চালানো। এটা এখন আর শুধু যান নয়, আমার পরিবারের একজন সদস্যের মতো। নিজের শরীরের মতো সাইকেলেরও নিয়মিত যত্ন নিই। এর প্রতি গভীর মায়া জন্মে গেছে।'
তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা স্থানীয়দের কাছে এক পরম বিস্ময় ও অনুপ্রেরণা। পাশের গ্রামের বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্বাস আলী মোল্লা বলেন, 'সামাদ ভাইকে আমাদের ছাত্রজীবন থেকেই একই সাইকেলে দেখছি। এই বয়সেও তিনি তরুণের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে সাইকেল চালান। এটা আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে।' ভবানীগঞ্জ কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও বাগমারা কলেজের সহকারী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, 'ছাত্রজীবনে সামাদ স্যারকে যেমন নিয়মিত সাইকেলে কলেজে আসতে-যেতে দেখেছি, এখনো একইভাবে দেখি। বহু বছর ধরে যত্নে রাখা ওই বাইসাইকেলটি সামাদ স্যারের স্মৃতি ও ভালোবাসার প্রতীক।'


























