মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
- আপডেট সময় : ০১:১৪:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

গত ৩০ জুলাই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে নতুন একটি সামুদ্রিক জোট প্রতিষ্ঠার ঘোষণায় স্বাক্ষর করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই জোটের স্থায়ী সদর দপ্তর, সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, যৌথ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, সামুদ্রিক অভিযান কেন্দ্র এবং স্থায়ী সচিবালয় সৌদি আরবে স্থাপন করা হবে। তবে জোটটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কোন দেশ কতটুকু সামরিক শক্তি দেবে, প্রয়োজনে কীভাবে অভিযান পরিচালিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবে কি না—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে আপাতত এটি একটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
নতুন জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরব ও মিসরের অংশগ্রহণ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে লোহিত সাগরের নিরাপত্তায় ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ শুরু হলেও সৌদি আরব ও মিসর তাতে অংশ নেয়নি। এবার তারা নতুন সামুদ্রিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলো শুধু অন্যের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে চায় না; বরং নিজেদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরো বড় ভূমিকা রাখতে চায়।
লোহিত সাগর ঘিরে এই উদ্যোগের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য নতুন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতারও যোগসূত্র রয়েছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ২০২৫ সালে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়। পরে তুরস্ক ও মিসরের মধ্যে সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ৭ আগস্ট মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন কাঠামো নিয়েও সমঝোতা হয়। এ ছাড়া সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ককে নিয়ে ‘আর৪’ নামে একটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামোও গড়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত কঠোর সামরিক জোটের পরিবর্তে বিভিন্ন দেশ এখন প্রয়োজন ও স্বার্থভিত্তিক একাধিক সহযোগিতাকাঠামোয় যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ, সব দেশের জন্য একই ধরনের সামরিক জোট গঠনের বদলে নির্দিষ্ট ইস্যুতে নির্দিষ্ট দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করছে। লোহিত সাগর অঞ্চলে হুথিদের কার্যক্রম নতুন জোট গঠনের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে হুথিদের হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট ও পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজ। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরও পড়তে শুরু করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি অংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে পরিচালনার প্রয়োজন বাড়ছে। ফলে লোহিত সাগরে নিরাপত্তাহীনতা সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বা সম্ভাব্য ফি আরোপের আশঙ্কাও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে রাষ্ট্রের বাইরে থাকা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে লোহিত সাগরের নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটকে শুধু একটি সামরিক উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব বজায় থাকলেও আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে। তবে নতুন এই জোট ও সহযোগিতা কাঠামোগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সদস্য দেশগুলোর সামরিক অবদান, যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং সংকটের সময় পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলো স্পষ্ট হলেই বোঝা যাবে—লোহিত সাগরে সত্যিই একটি নতুন জোট গড়ে উঠছে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় আরো বড় কোনো আঞ্চলিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২: ১৯আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২: ২৮




























