জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত, ঝুঁকিতে দেশের অর্থনীতি

- আপডেট সময় : ০৮:৩৪:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। কারখানার উৎপাদন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাকা ও পরিবহন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি যুক্ত। ফলে জ্বালানি সংকটকে কেবল কোনো একক খাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। সম্প্রতি দেশের শিল্প-কারখানায় তীব্র গ্যাস সংকট ও জ্বালানি রিজার্ভ দ্রুত কমে আসার যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা রূঢ় বাস্তবতার সামনে দেশটিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে পোশাক, স্টিল, সিরামিক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পের উৎপাদন ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, যা সার্বিক অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
দেশে জ্বালানির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উত্তোলন হ্রাস পাচ্ছে। নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এলএনজি সরবরাহ ও এর মূল্য বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। কেবল আমদানির ওপর নির্ভর করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, বরং দেশীয় উৎসের সর্বোত্তম ব্যবহার ও জ্বালানি খাতের বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি।
টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বড় ধরনের বিনিয়োগ জরুরি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার পাশাপাশি পুরনো গ্যাসক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে হবে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিল্প-কারখানার ছাদ, সরকারি ভবন ও অব্যবহৃত জমি কাজে লাগিয়ে ব্যাটারি স্টোরেজসহ আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে একাধিক উৎসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি এবং স্পট মার্কেটের ভারসাম্য রক্ষা করে সংকটের সময় কয়েক সপ্তাহের কৌশলগত রিজার্ভ নিশ্চিত করা চাই। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে নীতি পরিবর্তন না করে আগামী ২০ বছরের চাহিদা বিবেচনা করে একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
বর্তমান সংকট কাটাতে কিছু স্বল্পমেয়াদী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এক্সিলারেট এনার্জির ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ আংশিক চালুর মাধ্যমে প্রতিদিন ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া এবং নতুন কার্গো এলএনজি ক্রয়ের অনুমোদন শিল্প খাতে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। এছাড়া কূটনৈতিক তৎপরতায় প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি ও ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাবও ইতিবাচক। তবে মনে রাখতে হবে, এসব জোড়াতালির সাময়িক সমাধান দীর্ঘমেয়াদী স্বস্তি দেবে না। বিদ্যমান সীমিত গ্যাস রপ্তানিমুখী ও অগ্রাধিকারভিত্তিক শিল্পে সুষমভাবে বণ্টন করতে হবে এবং কারখানা সচল রাখতে নির্দিষ্ট শর্তে সিলিন্ডারজাত গ্যাস ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল পূর্বশর্ত। সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই জ্বালানি সংকট আগামীতে দেশের পুরো অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতায় রূপ নিতে পারে।


























