লাইভ চলাকালে গুলিতে হত্যা, মেক্সিকোর ইনফ্লুয়েন্সারদের টার্গেট করছে কারা?
- আপডেট সময় : ০৭:৪৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

মেক্সিকোর সিনালোয়া রাজ্যে ফেসবুক লাইভ চলাকালে সিজার গাস্তেলুম নামের এক তরুণ ইনফ্লুয়েন্সারকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। একটি ফাস্টফুড রেস্তোরাঁর বাইরে দুই বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার সময় ফেসবুকে লাইভস্ট্রিমে যুক্ত ছিলেন তিনি। ঠিক তখনই মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে আসে এবং চালক গাস্তেলুমের মাথায় একদম কাছ থেকে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। শত শত দর্শকের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটি মেক্সিকোর অপরাধী চক্র বা ড্রাগ কার্টেলগুলোর সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বিপজ্জনক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটি তদন্ত করছে সিনালোয়া রাজ্যের প্রসিকিউটরের কার্যালয়। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাস্তেলুমের পোস্ট করা কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট এই তদন্তের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র, যার বেশ কয়েকটি একটি নির্দিষ্ট অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তবে পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, গাস্তেলুমের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল না এবং তিনি পূর্বে কোনো হুমকিও পাননি। তা সত্ত্বেও, সিনালোয়া কার্টেলের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘাত শুরু হওয়ার পর গত দুই বছরে অন্তত ১০ জন কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রাণ হারিয়েছেন।
মেক্সিকোর ইবেরোআমেরিকান ইউনিভার্সিটির যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ক্লদিয়া আরুনিয়া এই প্রবণতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এবং ড্রাগ কার্টেল—উভয় পক্ষই দ্রুততম উপায়ে বিলাসবহুল জীবনযাপনকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে প্রচার করে। এখন আর নিয়মতান্ত্রিক ক্যারিয়ারের চেয়ে রাতারাতি উত্থানকেই সাফল্যের মডেল ধরা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসী জীবন তুলে ধরে তা পরোক্ষভাবে মাদকের ব্যবসার চালচিত্র ও শক্তির সঙ্গে মিলিয়ে প্রচার করা হয়, যা ‘নারকো-সংস্কৃতি’কে উৎসাহিত করে। নিহত গাস্তেলুম নিজেও দামি গাড়ি, বিলাসবহুল ভ্রমণ ও নৈশজীবনের ছবি শেয়ার করতেন। এমনকি ২০২৪ সালে খুন হওয়া আরেক ইনফ্লুয়েন্সার ‘এল গোর্ডো পেরুসি’র কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে দেখা গেছে তাকে।
অবশ্য মেক্সিকোর কনটেন্ট ক্রিয়েটররা নিজেদের ‘নারকো-ইনফ্লুয়েন্সার’ তকমা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, কুশিয়াকানের মতো সংঘাতপ্রবণ এলাকায় একজন তরুণ ও পরিচিত মুখ হিসেবে বিলাসী জীবন প্রদর্শন করলেই কার্টেলদের টার্গেটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করা এই কার্টেলগুলো নিজেদের ‘ব্র্যান্ড’ প্রচারের জন্য ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে থাকে। ফলে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল যখন একে অপরের মুখোমুখি হয়, তখন এক পক্ষের হয়ে প্রচারণা চালানো ব্যক্তিত্বরা অন্য পক্ষের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
এর একটি বড় উদাহরণ দেখা যায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, যখন কুশিয়াকান শহরের আকাশে বিমান থেকে প্রচারপত্র ফেলা হয়। সেখানে ২৫ জন ইনফ্লুয়েন্সার ও সংগীতশিল্পীকে ‘লা মায়িজা’ নামক একটি দলের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে চারজনকে হত্যার তালিকায় ‘নির্মূল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে আরও দুজন খুন হন।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাম জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং নির্দেশদাতাদের শাস্তির আওতায় আনতে স্থানীয় ও জাতীয় কর্তৃপক্ষ একযোগে কাজ করছে। একই সঙ্গে মেক্সিকো সরকার নানা পদক্ষেপে অপরাধ ও অপরাধী সংস্কৃতির সঙ্গে পপ কালচারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মেক্সিকোতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৪৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তা সত্ত্বেও, গাস্তেলুমের মতো প্রকাশ্য লাইভস্ট্রিমে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে—যা ইঙ্গিত দেয় যে রাস্তায় কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে, ড্রাগ কার্টেলগুলোর রক্তক্ষয়ী ক্ষমতার বলয় এখনো বিদ্যমান।

























