নবুয়তের অকাট্য প্রমাণ ও মুশরিকদের হঠকারী মনোভাবের স্বরূপ

- আপডেট সময় : ১২:০৪:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

আল্লাহতায়ালার অশেষ নেয়ামতের অন্যতম হলো তাঁর বান্দাদের হেদায়েতের জন্য নবী-রাসুল প্রেরণ করা। দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা ও প্রকৃত কল্যাণ লাভের একমাত্র পথই হলো রাসুলদের প্রদর্শিত পথ। ভালো ও মন্দের বিস্তারিত জ্ঞান শুধু তাঁরাই দিতে পারেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভও তাঁদের মাধ্যমেই সম্ভব। মানুষের আত্মার সুস্থতার জন্য রাসুলদের প্রয়োজন দেহের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি জরুরি। পৃথিবীতে যতদিন মানুষের মধ্যে নবুয়তের প্রভাব থাকবে, ততদিনই এ দুনিয়া টিকে থাকবে। আল্লাহতায়ালা নবী-রাসুলদের সত্যতা প্রমাণের জন্য স্পষ্ট নিদর্শন বা মুজিজাসহ পাঠিয়েছেন, যাতে সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, 'তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসেনি তোমাদের পূর্ববর্তীদের, নুহের সম্প্রদায়ের, আদের, সামুদের ও তাদের পরবর্তীদের? এদের বিষয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। এদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনসহ এদের রাসুল এসেছিল।' (সুরা ইবরাহিম : ৯)।
বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর নবুয়তের মুজিজাসমূহ অন্য যেকোনো নবীর তুলনায় অধিক ও সুস্পষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি এদের জন্যে আমার নিদর্শনাবলি ব্যক্ত করব, বিশ্বজগতে ও এদের নিজেদের মধ্যে; ফলে এদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, এটাই সত্য।' (সুরা হামিম সেজদা : ৫৩)। যখন কোরআন নাজিল হলো ও তার মধ্যে থাকা স্পষ্ট মুজিজা মুশরিকরা দেখল, তখন তারা বলল, এ কোরআন যদি মক্কা বা তায়েফের কোনো বড় ও সম্মানিত ব্যক্তির ওপর নাজিল হতো, তাহলে মানা যেত। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'আর তারা বলে, এই কোরআন কেন নাজিল করা হলো না দুই জনপদের কোনো প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির ওপর?' (সুরা জুখরুফ : ৩১)।
মুশরিকরা যখন কোরআনের মতো কোনো রচনা আনার চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে পারল না, তখন তারা মহানবী (সা.)-কে বলল, তুমি এই কোরআনের বদলে অন্য কোনো কোরআন আনো, অথবা একে বদলে দাও। আল্লাহ বলেন, 'যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তারা বলে, অন্য এক কোরআন আনো এটা ছাড়া বা একে বদলাও। বলো, নিজ থেকে এটা বদলানো আমার কাজ নয়।' (সুরা ইউনুস : ১৫)। পরে যখন তারা বুঝল যে, বিশ্বনবী (সা.) নিজে কোরআন বদলাতে পারেন না, তখন তারা চাইলো কোরআন যেন একসাথে একবারে নাজিল হয়। আল্লাহ বলেন, 'কাফেররা বলে, সমগ্র কোরআন তাঁর কাছে একবার অবতীর্ণ হলো না কেন?' (সুরা ফুরকান : ৩২)।
এরপর তাদের অহংকার ও জেদ আরও বেড়ে গেল। তারা এমন দাবি তুলল যে, মহানবী (সা.) যেন আকাশে মই বেয়ে উঠেন আর তারা তা দেখতেও পায়। তারপর আকাশ থেকে প্রত্যেকের নামে আলাদা আলাদা একটি কিতাব নিয়ে আসুন, যাতে লেখা থাকবে, 'এটা অমুকের ছেলে অমুকের নামে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো কিতাব।' মহান আল্লাহ বলেন, 'বস্তুত এদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ দেওয়া হোক।' (সুরা মুদ্দাসসির : ৫২)। যখন মুশরিকরা নিশ্চিত হলো যে, মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (সা.)-কে কোরআনের মতো এক মহা মুজিযার মাধ্যমে সাহায্য করেছেন, তখন তারা অহংকার ও একগুঁয়েমি করে তাঁর নবুয়তকে অস্বীকার করল। তারা বলল, 'তাঁর সঙ্গে কোনো ফেরেশতা অবতরণ করল না কেন, যে তাঁকে সাহায্য করত?' তারা আরও বাড়িয়ে বলল, 'আমাদের কাছে তো একদল ফেরেশতা আসা দরকার ছিল পেছনে-পেছনে ও দলে দলে, যারা আমাদের বলে দিত যে, তুমি হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে প্রেরিত রাসুল।'
তারা এতটাই অহংকারে পড়ে গেল যে, তারা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছেই সরাসরি কথা বলার দাবি করল। এ সম্পর্কে কোরআনে এসেছে, 'আর যারা কিছু জানে না তারা বলে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে কথা বলেন না কেন? কিংবা কোনো নিদর্শন আমাদের কাছে আসে না কেন?' (সুরা বাকারা : ১১৮)। তারা নিজেদের বড় মনে করে বলল, আমরা তখনই বিশ্বাস করব, যখন আমাদের কাছেও ফেরেশতা আসবে, যেমনটি আসে নবীদের কাছে। কোরআনে এসেছে, 'যখন তাদের কাছে কোনো নিদর্শন আসে তারা তখন বলে, আল্লাহর রাসুলগণকে যা দেওয়া হয়েছিল আমাদেরকেও তা না দেওয়া পর্যন্ত আমরা কখনও বিশ্বাস করব না।' (সুরা আনআম : ১২৪)। এ বক্তব্যের জবাবে আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব কার ওপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভালো জানেন।' (সুরা আনআম : ১২৪)।
ধর্মীয় দিক দিয়ে যখন তারা কিছুতেই নবীজিকে কষ্ট দিতে পারল না, তখন তারা দুনিয়াবি দাবি-দাওয়া করতে শুরু করল। তারা মক্কার সেই নির্জন ও অনুর্বর উপত্যকায় বসে মহানবী (সা.)-কে বলল, 'যদি তুমি সত্যিকারের নবী হও, তাহলে তোমার জন্য খেজুর ও আঙুরের বাগান হওয়া উচিত, যার মাঝে তুমি ঝরনা ও নদী বইয়ে দিতে পারো।' তারা আরও বলল, 'অথবা তোমার একটি স্বর্ণ নির্মিত ঘর হবে বা তুমি আকাশে আরোহণ করবে।' (সুরা বনি ইসরায়েল : ৯৩)। তারা আকাশ থেকে ধনভাণ্ডার নামার দাবিও জানাল। যখন তাদের এসব দাবি বাস্তবায়িত হলো না, তখন তারা নবীজিকে বলল, 'এটা যদি তোমার পক্ষ থেকে সত্য হয়, তাহলে আমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রস্তর বর্ষণ করো কিংবা আমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দাও।' (সুরা আনফাল : ৩২)। তারা নিজেদের সম্পর্কে এতটাই গর্ব করত যে, নবী (সা.)-কে বলতে লাগল যেন তিনি দ্রুত আজাব নিয়ে আসেন। তারা আজাবের ধরনও নির্দিষ্ট করে দিল। তারা বলল, আকাশ টুকরো টুকরো হয়ে তাদের ওপর পড়ে যাক অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাগণকে তাদের সামনে উপস্থিত করা হোক। (সুরা বনি ইসরায়েল : ৯২)।
যখন তারা দেখল নবীজি কোনো নিদর্শন বা মুজিজা নিজের পক্ষ থেকে তৈরি করছেন না, তখন তারা ব্যঙ্গ করে বলল, 'তুমি নিজেই একটি নিদর্শন বেছে নাও না কেন?' আল্লাহতায়ালা বলেন, 'বল, আমার প্রতিপালকের মাধ্যমে আমি যে বিষয়ে প্রত্যাদিষ্ট হই, আমি তো শুধু তারই অনুসরণ করি।' (সুরা আরাফ : ২০৩)। যদি কেউ নবুয়তের সত্যতা ও এর প্রমাণ জানতে চায়, তার জন্য সবচেয়ে বড় দলিল হলো মহাগ্রন্থ কোরআন। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, 'প্রত্যেক নবীকেই আল্লাহ এমন কিছু নিদর্শন দিয়েছেন, যার মাধ্যমে মানুষ ঈমান এনেছে। আর আমাকে যেটা দেওয়া হয়েছে, সেটা হলো অহি বা প্রত্যাদেশ যা আল্লাহ আমার প্রতি নাজিল করেছেন। তাই আমি আশা করি, কেয়ামতের দিন আমার অনুসারীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি হবে।' (বোখারি : ৪৯৮১)।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, 'যখন আল্লাহ কোনো নবী পাঠান ও তাঁর হাতে এমন মুজিজা দেন, যা তার সত্যতা প্রমাণ করে- তখনই হুজ্জত কায়েম হয়ে যায়, সত্য সুস্পষ্ট হয়। এরপর যদি কেউ আরও নিদর্শন চায়, তবে তার দাবি মানা জরুরি নয়, বরং অনেক সময় তা মানা উচিতও নয়। কারণ, যদি এক নিদর্শনের পর আরেকটা দেওয়া হয়, তখন তারা তৃতীয়টা চাইবে; তৃতীয়টা দিলে আবার চতুর্থটা চাইবে। আর এইরকম একগুঁয়ে ও জেদি লোকদের দাবি-দাওয়া তো শেষ হবার নয়।' তাছাড়া, যাদের কাছে নবীকে পাঠানো হয়েছে, তাদের এ অধিকার নেই যে, তারা নিজেদের ইচ্ছামতো যেকোনো মুজিজা চেয়ে বসবে। নবুয়তের সত্যতা প্রমাণের জন্য মুশরিকদের এমন সব প্রস্তাব মানা বাধ্যতামূলক নয়। তারা যেসব চাহিদা পেশ করত, তা আসলে হেদায়েত বা পথপ্রাপ্তির গ্যারান্টি নয়, বরং এর মাধ্যমে শুধু তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলাম ধর্ম দুটি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। এক. এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। দুই. এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। মানুষ যত বেশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করবে, তত বেশি সে আল্লাহর প্রতি তাওহিদে পরিপূর্ণ ও দ্বীনে আন্তরিক হবে। আর কেউ যত বেশি রাসুলের অনুসরণ থেকে দূরে থাকবে, তার দ্বীন ততই দুর্বল ও অপূর্ণ হবে।


























