ঢাকা ০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে সৌদি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর জুলাই বিপ্লবের দুই বছর: রক্তে লেখা বিজয়ের স্মরণে দেশ ইরান ইস্যুতে কৌশলগত সংকটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রিজার্ভ বেড়ে ৩৬.৫৯ বিলিয়ন ডলার, রেমিট্যান্সে বড় লাফ বরগুনার তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ আদালতের হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যে ভারতের সম্পৃক্ততা নেই: নয়াদিল্লি আল-আকসায় ইসরায়েলি হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় জরুরি বৈঠক ডাকল জর্দান পত্নীতলায় ৯৪ কেজি ওজনের প্রাচীন বিষ্ণু মূর্তি উদ্ধার করল বিজিবি কারামুক্ত হলেন তনু হত্যা মামলার একমাত্র আসামি হাফিজুর

আলিফের ক্ষত ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিপজ্জনক স্বাভাবিকীকরণ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:০৫:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু বর্তমানে উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সহিংসতার ব্যাখ্যা প্রদানের ধরণ। আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের গবেষণায় দেখা যায়, রাজনৈতিক শক্তিগুলো কেবল ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না, বরং ঘটনার অর্থও নিজেদের মতো করে সাজাতে চায়। অতীতে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনাকে ‘জনরোষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করতেন, যা ছিল সহিংসতার এক ধরণের ন্যায্যতা তৈরির প্রক্রিয়া। বর্তমানে সেই দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়ে সহিংসতাকে প্রকাশ্যে উদ্‌যাপন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি হবিগঞ্জে একটি অহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ছাত্রদলের হামলায় আলিফ নামের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ গুরুতর আহত হয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, তাঁর চোখে রড দিয়ে আঘাত করা হয়েছে এবং অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেছেন যে তাঁর বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে, পাশাপাশি ডান চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে পড়েছে। একই ঘটনায় বিরোধী কর্মীদের বহনকারী একটি রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানের চালকও মারধরের শিকার হন।

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, এমন নৃশংস ঘটনার পরও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার চাওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে এই সহিংসতাকে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এই হামলাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই পরিস্থিতি হবিগঞ্জ থেকে গোলাপগঞ্জ পর্যন্ত সহিংসতাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা একটি বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে যে রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল গ্রহণযোগ্যই নয়, প্রয়োজনে তা বারবার ঘটানো হবে।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যে সমাজে রাজনৈতিক সহিংসতা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, সেখানে বিনিয়োগ কমে যায়, মানুষের পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয় এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণেও বারবার উঠে এসেছে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফ্যাসিবাদ বা নাৎসিবাদের উত্থানের শুরুতে রাজনৈতিক সহিংসতাকে ‘দেশপ্রেম’ বা ‘শৃঙ্খলা’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকে অস্থির করে তুলেছিল।

গণতন্ত্রের মূল শিক্ষা হলো কথার জবাব কথা এবং যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া, অপরাধের বিচার হওয়া উচিত আদালতে। প্রতিপক্ষকে মারধর করে বা আহত মানুষের ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসাহাসি করে সাময়িক উল্লাস পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এতে কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। বরং এমন একটি সমাজ তৈরি হয় যেখানে যুক্তির বদলে শক্তি এবং ভোটের বদলে ভয় কাজ করে। পরিশেষে, যে সমাজে সহিংসতা রাজনৈতিক যোগাযোগের স্বীকৃত মাধ্যম হয়ে যায়, সেখানে সরকার, বিরোধী দল বা সাধারণ নাগরিক—কেউই নিরাপদ থাকে না।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

আলিফের ক্ষত ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিপজ্জনক স্বাভাবিকীকরণ

আপডেট সময় : ০৫:০৫:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
print news

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু বর্তমানে উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সহিংসতার ব্যাখ্যা প্রদানের ধরণ। আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের গবেষণায় দেখা যায়, রাজনৈতিক শক্তিগুলো কেবল ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না, বরং ঘটনার অর্থও নিজেদের মতো করে সাজাতে চায়। অতীতে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনাকে ‘জনরোষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করতেন, যা ছিল সহিংসতার এক ধরণের ন্যায্যতা তৈরির প্রক্রিয়া। বর্তমানে সেই দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়ে সহিংসতাকে প্রকাশ্যে উদ্‌যাপন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি হবিগঞ্জে একটি অহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ছাত্রদলের হামলায় আলিফ নামের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ গুরুতর আহত হয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, তাঁর চোখে রড দিয়ে আঘাত করা হয়েছে এবং অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেছেন যে তাঁর বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে, পাশাপাশি ডান চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে পড়েছে। একই ঘটনায় বিরোধী কর্মীদের বহনকারী একটি রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানের চালকও মারধরের শিকার হন।

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, এমন নৃশংস ঘটনার পরও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার চাওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে এই সহিংসতাকে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এই হামলাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই পরিস্থিতি হবিগঞ্জ থেকে গোলাপগঞ্জ পর্যন্ত সহিংসতাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা একটি বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে যে রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল গ্রহণযোগ্যই নয়, প্রয়োজনে তা বারবার ঘটানো হবে।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যে সমাজে রাজনৈতিক সহিংসতা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, সেখানে বিনিয়োগ কমে যায়, মানুষের পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয় এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণেও বারবার উঠে এসেছে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফ্যাসিবাদ বা নাৎসিবাদের উত্থানের শুরুতে রাজনৈতিক সহিংসতাকে ‘দেশপ্রেম’ বা ‘শৃঙ্খলা’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকে অস্থির করে তুলেছিল।

গণতন্ত্রের মূল শিক্ষা হলো কথার জবাব কথা এবং যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া, অপরাধের বিচার হওয়া উচিত আদালতে। প্রতিপক্ষকে মারধর করে বা আহত মানুষের ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসাহাসি করে সাময়িক উল্লাস পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এতে কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। বরং এমন একটি সমাজ তৈরি হয় যেখানে যুক্তির বদলে শক্তি এবং ভোটের বদলে ভয় কাজ করে। পরিশেষে, যে সমাজে সহিংসতা রাজনৈতিক যোগাযোগের স্বীকৃত মাধ্যম হয়ে যায়, সেখানে সরকার, বিরোধী দল বা সাধারণ নাগরিক—কেউই নিরাপদ থাকে না।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo