ঢাকা ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মুকসুদপুরে পৃথক স্থান থেকে নারীসহ দুইজনের মরদেহ উদ্ধার ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত ৫ গুণ বাড়ালো ইসি মেসির বিদায়ী ম্যাচের টিকিট বিক্রির নতুন সময়সূচি ঘোষণা নোয়াখালীতে নিম্নমানের সেতু নির্মাণ, দুই প্রকৌশলীর কৈফিয়ত তলব নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে আগাম আলু চাষে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন বরিশালে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ সাবেক সাত এমপি ও তাদের স্বজনদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা আপা আর ফিরে আসবে না, খুনিদের ছাড় নেই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী বারিধারায় গাড়িচাপা: কিশোর চালক আজান আলী শরীফ অবশেষে গ্রেপ্তার সম্ভাবনা থেকে সংকটে গণঅধিকার পরিষদ: রাজনীতির মাঠে টিকে থাকার লড়াই

আফ্রিকার বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন দিগন্ত

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১০:০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



বিশ্বরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইউরোপের নিরাপত্তা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও বহুমুখী, বাস্তববাদী এবং ভবিষ্যতমুখী হতে হবে। বাংলাদেশের উচিত বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে একই সঙ্গে এই অঞ্চলের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, যেখানে আগামী কয়েক দশকে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাজার সম্প্রসারণ ঘটবে। সেই বিবেচনায় আফ্রিকা বাংলাদেশের জন্য একটি অসাধারণ কৌশলগত সুযোগ। বর্তমানে আফ্রিকার সম্মিলিত অর্থনীতির আকার প্রায় ৩.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মহাদেশটির জনসংখ্যা ১.৫ বিলিয়নেরও বেশি। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার জনসংখ্যা প্রায় ২.৫ বিলিয়ন এবং অর্থনীতির আকার প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

আফ্রিকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া (ACfFTA)। এটি বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে ৫৪টি দেশ একটি অভিন্ন বাজার গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই উদ্যোগের ফলে আন্তঃআফ্রিকান বাণিজ্য বৃদ্ধি, শুল্ক বাধা হ্রাস এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি আফ্রিকার কোনো একটি দেশে কৃষি, উৎপাদনশিল্প বা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারে, তাহলে সেই উৎপাদিত পণ্য তুলনামূলক সহজে আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও রপ্তানির সুযোগ পাবে। অর্থাৎ, একটি দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে পুরো মহাদেশের বিশাল বাজারে প্রবেশের কৌশলগত সুবিধা অর্জন করা সম্ভব হবে।

আফ্রিকার কৌশলগত খনিজ বা Critical minerals বাংলাদেশের জন্য ব্যবসার নতুন দিগন্ত। বিশ্ব যখন বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কোবাল্ট, লিথিয়াম, তামা, গ্রাফাইট ও ম্যাঙ্গানিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের উচিত দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি এসব কৌশলগত খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাণিজ্য, প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস ও আফ্রিকার সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা। যে দেশগুলো আগেভাগে এই খাতে বিনিয়োগ ও দক্ষতা অর্জন করতে পারবে, তারা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শিল্প ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের ১৮ কোটিরও বেশি জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে ভবিষ্যৎমুখী শিল্প, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত খনিজভিত্তিক অর্থনীতিতে এখন থেকেই পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে হবে।

আফ্রিকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান শুধু একটি সামরিক সাফল্য নয়, এটি দেশের জন্য এক অমূল্য কূটনৈতিক সম্পদ। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের পেশাদারিত্ব, মানবিকতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যে আস্থা, সম্মান ও শুভেচ্ছা অর্জন করেছেন, তা আজ বাংলাদেশের অন্যতম বড় সফট পাওয়ার। সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির নির্বাচনে আফ্রিকান দেশগুলোর সমর্থন বাংলাদেশ ও আফ্রিকার মধ্যকার দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। এই আস্থার ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি একটি সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি 'জাতীয় আফ্রিকা কৌশল' (National Africa Strategy) গ্রহণ করে, তবে নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে সহযোগিতা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো ইতোমধ্যেই আফ্রিকার কৌশলগত গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে এবং বিশেষ প্রতিনিধি বা উচ্চপর্যায়ের দূত নিয়োগের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি শক্তিশালী করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং রাশিয়া তাদের নিজস্ব বিশেষ প্রতিনিধির মাধ্যমে আফ্রিকায় অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই উদাহরণগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, আফ্রিকা আর বৈশ্বিক কূটনীতির প্রান্তিক অঞ্চল নয়, বরং আগামী কয়েক দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে শীঘ্রই আফ্রিকা বিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি বিশেষ দূত, বিশেষ প্রতিনিধি, আফ্রিকা বিষয়ক সমন্বয়কারী অথবা সরকারের উপযুক্ত বিবেচনায় অন্য কোনো কাঠামো হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ সমন্বয় করা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, কূটনৈতিক মিশন ও বেসরকারি খাতের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কৃষি সহযোগিতা, খাদ্য নিরাপত্তা, শ্রমবাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে একটি অভিন্ন জাতীয় কৌশলের আওতায় নিয়ে আসা।

বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিতভাবে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ করে, তাহলে একই সঙ্গে তিনটি জাতীয় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। প্রথমত, আফ্রিকার উর্বরা ও অব্যবহৃত জমিতে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ (Contract Farming) ও কৃষি বিনিয়োগের মাধ্যমে চাল, ডাল, সয়াবিন ও রসুনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে আফ্রিকার আঞ্চলিক বাজারের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও পূরণ করা যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানি করে। উদাহরণস্বরূপ ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের আমদানির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, চাল প্রায় ৫ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন (মৌসুমভেদে), যার মূল্য প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সয়াবিন তেল প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন, ভোজ্যতেল আমদানিতে বছরে ২ বিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। একইভাবে বছরে মসুর ডাল প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন, যার মূল্য আনুমানিক ৫৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদি আফ্রিকায় বাংলাদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব কৃষিপণ্য উৎপাদন করা যায়, তবে প্রথমে আফ্রিকার বাজারে সরবরাহ এবং অতিরিক্ত উৎপাদন বাংলাদেশে এনে আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতে দক্ষ ও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি জনশক্তির জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের শক্তিশালী শিল্পখাতের জন্য নতুন বাজার হিসেবে আফ্রিকা শুধু কৃষির জন্য নয়, বাংলাদেশের ওষুধ, তৈরি পোশাক, সিরামিক, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্যও একটি বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বিশেষ করে বাংলাদেশের জেনেরিক ওষুধ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম অর্জন করেছে। একইভাবে ডিজিটাল সেবা, ফিনটেক, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-গভর্ন্যান্স এবং সফটওয়্যার উন্নয়নের মতো খাতেও বাংলাদেশ আফ্রিকার অনেক দেশের উন্নয়ন সহযোগী হতে পারে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত বহু উদ্যোক্তা কয়েক দশক ধরে আফ্রিকায় বিনিয়োগ করে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। সিয়েরা লিওনে রাবার উৎপাদন থেকে শুরু করে উৎপাদনশিল্প, কৃষি, ভোগ্যপণ্য, ইস্পাত, লজিস্টিকস, অর্থনীতি ও আর্থিক খাতে তারা হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। প্রতীক সূরি, বিমল শাহ, সুধীর রূপারেলিয়া এবং মোহাম্মদ দেউজির মতো উদ্যোক্তাদের সাফল্য প্রমাণ করে যে আফ্রিকা শুধু একটি বাজার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম সেরা গন্তব্য। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিদেশে অটেল সম্পদ, বেগম পাড়াতে বিলাস বহুল বাড়ি তৈরি বা অনুৎপাদনশীল খাতে মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিবর্তে আফ্রিকার দ্রুত ক্রমবর্ধমানশীল অর্থনীতিতে শিল্প ও কৃষিভিত্তিক বিনিয়োগ করা হলে তা একই সঙ্গে উভয় দেশের জন্য কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশের উচিত একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘জাতীয় আফ্রিকা কৌশল’ প্রণয়ন করা। যেখানে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের লক্ষ্য নির্ধারণ, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশ, সম্ভাবনাময় খাত, বিনিয়োগ পরিকল্পনা, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই কৌশল বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিডা (BIDA), বেসরকারি খাত এবং কূটনৈতিক মিশনগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি সুসংগঠিত জাতীয় কৌশল থাকলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে বাংলাদেশ আফ্রিকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। আফ্রিকার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা শুধু নতুন বাজার খুঁজে পাওয়ার বিষয় নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, কৃষি, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি সমন্বিত ভবিষ্যৎ কৌশল। আজ যে দেশগুলো আফ্রিকায় দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করছে, আগামী দিনগুলোতে তারাই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন নেতৃত্ব দেবে। বাংলাদেশ যদি এখনই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে আফ্রিকা আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই ‘আগামীর অর্থনৈতিক সীমান্ত’ হয়ে উঠতে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy

নিউজটি শেয়ার করুন

আফ্রিকার বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন দিগন্ত

আপডেট সময় : ১০:০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইউরোপের নিরাপত্তা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও বহুমুখী, বাস্তববাদী এবং ভবিষ্যতমুখী হতে হবে। বাংলাদেশের উচিত বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে একই সঙ্গে এই অঞ্চলের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, যেখানে আগামী কয়েক দশকে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাজার সম্প্রসারণ ঘটবে। সেই বিবেচনায় আফ্রিকা বাংলাদেশের জন্য একটি অসাধারণ কৌশলগত সুযোগ। বর্তমানে আফ্রিকার সম্মিলিত অর্থনীতির আকার প্রায় ৩.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মহাদেশটির জনসংখ্যা ১.৫ বিলিয়নেরও বেশি। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার জনসংখ্যা প্রায় ২.৫ বিলিয়ন এবং অর্থনীতির আকার প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

আফ্রিকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া (ACfFTA)। এটি বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে ৫৪টি দেশ একটি অভিন্ন বাজার গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই উদ্যোগের ফলে আন্তঃআফ্রিকান বাণিজ্য বৃদ্ধি, শুল্ক বাধা হ্রাস এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি আফ্রিকার কোনো একটি দেশে কৃষি, উৎপাদনশিল্প বা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারে, তাহলে সেই উৎপাদিত পণ্য তুলনামূলক সহজে আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও রপ্তানির সুযোগ পাবে। অর্থাৎ, একটি দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে পুরো মহাদেশের বিশাল বাজারে প্রবেশের কৌশলগত সুবিধা অর্জন করা সম্ভব হবে।

আফ্রিকার কৌশলগত খনিজ বা Critical minerals বাংলাদেশের জন্য ব্যবসার নতুন দিগন্ত। বিশ্ব যখন বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কোবাল্ট, লিথিয়াম, তামা, গ্রাফাইট ও ম্যাঙ্গানিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের উচিত দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি এসব কৌশলগত খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাণিজ্য, প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস ও আফ্রিকার সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা। যে দেশগুলো আগেভাগে এই খাতে বিনিয়োগ ও দক্ষতা অর্জন করতে পারবে, তারা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শিল্প ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের ১৮ কোটিরও বেশি জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে ভবিষ্যৎমুখী শিল্প, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত খনিজভিত্তিক অর্থনীতিতে এখন থেকেই পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে হবে।

আফ্রিকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান শুধু একটি সামরিক সাফল্য নয়, এটি দেশের জন্য এক অমূল্য কূটনৈতিক সম্পদ। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের পেশাদারিত্ব, মানবিকতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যে আস্থা, সম্মান ও শুভেচ্ছা অর্জন করেছেন, তা আজ বাংলাদেশের অন্যতম বড় সফট পাওয়ার। সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির নির্বাচনে আফ্রিকান দেশগুলোর সমর্থন বাংলাদেশ ও আফ্রিকার মধ্যকার দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। এই আস্থার ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি একটি সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি 'জাতীয় আফ্রিকা কৌশল' (National Africa Strategy) গ্রহণ করে, তবে নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে সহযোগিতা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো ইতোমধ্যেই আফ্রিকার কৌশলগত গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে এবং বিশেষ প্রতিনিধি বা উচ্চপর্যায়ের দূত নিয়োগের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি শক্তিশালী করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং রাশিয়া তাদের নিজস্ব বিশেষ প্রতিনিধির মাধ্যমে আফ্রিকায় অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই উদাহরণগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, আফ্রিকা আর বৈশ্বিক কূটনীতির প্রান্তিক অঞ্চল নয়, বরং আগামী কয়েক দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে শীঘ্রই আফ্রিকা বিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি বিশেষ দূত, বিশেষ প্রতিনিধি, আফ্রিকা বিষয়ক সমন্বয়কারী অথবা সরকারের উপযুক্ত বিবেচনায় অন্য কোনো কাঠামো হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ সমন্বয় করা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, কূটনৈতিক মিশন ও বেসরকারি খাতের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কৃষি সহযোগিতা, খাদ্য নিরাপত্তা, শ্রমবাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে একটি অভিন্ন জাতীয় কৌশলের আওতায় নিয়ে আসা।

বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিতভাবে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ করে, তাহলে একই সঙ্গে তিনটি জাতীয় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। প্রথমত, আফ্রিকার উর্বরা ও অব্যবহৃত জমিতে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ (Contract Farming) ও কৃষি বিনিয়োগের মাধ্যমে চাল, ডাল, সয়াবিন ও রসুনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে আফ্রিকার আঞ্চলিক বাজারের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও পূরণ করা যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানি করে। উদাহরণস্বরূপ ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের আমদানির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, চাল প্রায় ৫ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন (মৌসুমভেদে), যার মূল্য প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সয়াবিন তেল প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন, ভোজ্যতেল আমদানিতে বছরে ২ বিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। একইভাবে বছরে মসুর ডাল প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন, যার মূল্য আনুমানিক ৫৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদি আফ্রিকায় বাংলাদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব কৃষিপণ্য উৎপাদন করা যায়, তবে প্রথমে আফ্রিকার বাজারে সরবরাহ এবং অতিরিক্ত উৎপাদন বাংলাদেশে এনে আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতে দক্ষ ও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি জনশক্তির জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের শক্তিশালী শিল্পখাতের জন্য নতুন বাজার হিসেবে আফ্রিকা শুধু কৃষির জন্য নয়, বাংলাদেশের ওষুধ, তৈরি পোশাক, সিরামিক, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্যও একটি বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বিশেষ করে বাংলাদেশের জেনেরিক ওষুধ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম অর্জন করেছে। একইভাবে ডিজিটাল সেবা, ফিনটেক, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-গভর্ন্যান্স এবং সফটওয়্যার উন্নয়নের মতো খাতেও বাংলাদেশ আফ্রিকার অনেক দেশের উন্নয়ন সহযোগী হতে পারে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত বহু উদ্যোক্তা কয়েক দশক ধরে আফ্রিকায় বিনিয়োগ করে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। সিয়েরা লিওনে রাবার উৎপাদন থেকে শুরু করে উৎপাদনশিল্প, কৃষি, ভোগ্যপণ্য, ইস্পাত, লজিস্টিকস, অর্থনীতি ও আর্থিক খাতে তারা হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। প্রতীক সূরি, বিমল শাহ, সুধীর রূপারেলিয়া এবং মোহাম্মদ দেউজির মতো উদ্যোক্তাদের সাফল্য প্রমাণ করে যে আফ্রিকা শুধু একটি বাজার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম সেরা গন্তব্য। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিদেশে অটেল সম্পদ, বেগম পাড়াতে বিলাস বহুল বাড়ি তৈরি বা অনুৎপাদনশীল খাতে মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিবর্তে আফ্রিকার দ্রুত ক্রমবর্ধমানশীল অর্থনীতিতে শিল্প ও কৃষিভিত্তিক বিনিয়োগ করা হলে তা একই সঙ্গে উভয় দেশের জন্য কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশের উচিত একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘জাতীয় আফ্রিকা কৌশল’ প্রণয়ন করা। যেখানে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের লক্ষ্য নির্ধারণ, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশ, সম্ভাবনাময় খাত, বিনিয়োগ পরিকল্পনা, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই কৌশল বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিডা (BIDA), বেসরকারি খাত এবং কূটনৈতিক মিশনগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি সুসংগঠিত জাতীয় কৌশল থাকলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে বাংলাদেশ আফ্রিকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। আফ্রিকার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা শুধু নতুন বাজার খুঁজে পাওয়ার বিষয় নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, কৃষি, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি সমন্বিত ভবিষ্যৎ কৌশল। আজ যে দেশগুলো আফ্রিকায় দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করছে, আগামী দিনগুলোতে তারাই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন নেতৃত্ব দেবে। বাংলাদেশ যদি এখনই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে আফ্রিকা আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই ‘আগামীর অর্থনৈতিক সীমান্ত’ হয়ে উঠতে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy