ক্ষমতার পাঁচ মাসে কেন হতাশ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, কী বলছে পরিস্থিতি
- আপডেট সময় : ০৫:৫০:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন বিজেপি সরকারকে ঘিরে যে উচ্চাশা ছিল, পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর তা কিছুটা থমকে দাঁড়িয়েছে। ‘এমন পরিস্থিতির জন্যই কি আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম?’ বস্তুত এই হতাশার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। টানা ১৫ বছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের শাসনের পালা শেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকার। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রশাসনিক নীতি এবং দলীয় নেতাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও পরস্পরবিরোধী মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্পপতি—সব মহলেই এখন এক ধরনের হতাশা ও অনিশ্চয়তার সুর শোনা যাচ্ছে।
রাজ্যের শিল্প ও জমি নীতি নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ইতিমধ্যে স্বীকার করেছেন যে, পূর্বতন তৃণমূল সরকারের রেখে যাওয়া ২০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া এবং অন্যান্য জটিলতার কারণে নতুন শিল্প কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। টাটা গ্রুপের শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তনের ফলে বড় বিনিয়োগের আশাও ফিকে হয়ে এসেছে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণ নিয়ে আইনি জটিলতা নতুন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
সরকারের শুরুর দিকের কিছু পদক্ষেপ ব্যাপক জনরোষের কারণ হয়েছে। ফুটপাত ও রেলের জমি থেকে হকার উচ্ছেদের অভিযান পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ছাড়াই শুরু হওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ। একইসঙ্গে বহুতল নির্মাণের অনুমতি বন্ধ থাকায় রিয়েল এস্টেট শিল্পে মন্দা দেখা দিয়েছে। সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ নিয়েও নাম নথিভুক্তকরণে বিভ্রাট তৈরি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে ‘পাবলিক সেফটি বিল’ এবং সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশকারী শনাক্তের অভিযানে সাধারণ মানুষের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। সীমান্ত লাগোয়া গ্রামগুলোতে নথি পরীক্ষার ঘটনাকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। পাশাপাশি বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেট চালানোর মতো গুরুতর অভিযোগও সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের উপস্থিতিতে ফুটপাতবাসীদের উচ্ছেদের ঘটনা এবং পরবর্তীতে পুনর্বাসন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সরকারের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। দুর্গাপূজার বিজ্ঞাপনে দেবীর রূপ পরিবর্তন এবং থিম পূজা নিয়ে নেতাদের নেতিবাচক মন্তব্য মৃৎশিল্পীদের ব্যবসায় মন্দা তৈরি করেছে। এছাড়া এক উত্তর ভারতীয় ধর্মগুরুর বাঙালিকে ‘পাখণ্ডী’ আখ্যা দেওয়া নিয়ে রাজ্যজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা প্রশমিত করতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে মাঠে নামতে হয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব এবং ৯ সেপ্টেম্বর কলকাতার গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত গেরুয়া সম্মানযাত্রা বা মহামিছিলের নেতৃত্ব ও নাগা সাধুদের আস্ফালন নিয়েও তীব্র সমালোচনা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে আগ্রাসী ভাষা ব্যবহার এবং দলের অভ্যন্তরে তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের আধিপত্য নিয়ে পুরনো বিজেপি সমর্থকদের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। সব মিলিয়ে, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার নির্ধারণে ভুল, হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং নেতা-নেত্রীদের বেপরোয়া আচরণ পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের পথে এক জটিল দেয়াল তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।




























