ঢাকা ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৬ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত রাজধানীতে ২৩ শতাংশ বাস চলছে কোনো বৈধ ফিটনেস সনদ ছাড়াই ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদে নিখোঁজ কৃষক, উদ্ধার অভিযান স্থগিত প্রামাণ্যচিত্রে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ, অনুষ্ঠান ছাড়লেন আখতার হোসেন আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব আসন্ন, প্রস্তুতির আহ্বান জামায়াত আমীরের যুক্তরাজ্যের চিভনিং স্কলারশিপ: ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষের আবেদনের সুযোগ হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার খবরে বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মঞ্চে আসন পেলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস জড়তা কাটাতে শুটিংয়ের আগে গালিগালাজের অনুশীলন করেছিলেন দীপিকা দেশের প্রথম রাষ্ট্রীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এক্সিট সম্পন্ন করল স্টার্টআপ বাংলাদেশ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৫১:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

অন্তর্বর্তী সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, যখন দেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই রাষ্ট্র মোটেই ছোট নয়। তবে এই কঠিন বাস্তবতার বিপরীতে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিরল এক জাতীয় ঐক্য। মানুষের প্রত্যাশা ছিল হিমালয়-সমান, যেখানে তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছিল। এই আন্দোলনের মূলে ছিল তিনটি প্রধান আকাঙ্ক্ষা—জাতীয় ঐক্যের দৃঢ়তা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা।

ইতিহাস নির্মোহভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান করবে। তাদের সাফল্যের মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বড় কোনো বিপর্যয় এড়ানো এবং নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। তবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ভিত্তি হিসেবে জাতীয় ঐক্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে তারা আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং কতিপয় উপদেষ্টার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিকে বেশি মনোযোগী ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের অংশীদারিত্বের চেয়ে আমলাতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বিদেশিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা সরকারের গতিশীলতা ব্যাহত করেছে।

জুলাইয়ের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষা ক্রমে ‘সংস্কার’ নামক প্রশাসনিক শব্দে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, যা কিছু বিশেষজ্ঞ ও ‘যমুনা’র ঘেরাটোপে আটকা পড়েছিল। এছাড়া আন্দোলনের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক এবং তরুণদের বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়ার ফলে তাদের ক্ষমতায়নের পরিবর্তে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি হলেও, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান ও বৈষম্য দূর করার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো অন্তরালেই থেকে গেছে।

বর্তমানে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তবে তাদের শাসনকালের মাত্র কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ায় চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। সংসদ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চালু হওয়া এবং বিরোধী দলের অংশগ্রহণ স্বাভাবিকতার লক্ষণ হলেও, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে। এক্ষেত্রে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে ‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে বসানোই হবে পরিবর্তনের বড় পরীক্ষা।

শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা এবং তরুণদের শিক্ষামুখিতা হ্রাস পাওয়া বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। এছাড়া হামে কয়েক শ শিশুর মৃত্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনীয় বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে প্রশ্ন নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণের পরিসর কিছুটা সীমিত করেছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২-এর ঘরে নেমে আসা এবং তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

পরিশেষে, জুলাইয়ের মূল্যায়নে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, সমাজের সক্রিয়তা ও আত্মবিশ্বাস কতটা ধরে রাখা গেল তা গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক উদ্যোগ, স্থানীয় পর্যায়ের পরিবর্তনের চেষ্টা এবং সব ধরনের বিভাজন কাটিয়ে জাতীয় ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা টিকিয়ে রাখা জরুরি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা—ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা—সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজসহ প্রতে৵ক নাগরিকের।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা

আপডেট সময় : ০৭:৫১:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
print news

অন্তর্বর্তী সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, যখন দেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই রাষ্ট্র মোটেই ছোট নয়। তবে এই কঠিন বাস্তবতার বিপরীতে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিরল এক জাতীয় ঐক্য। মানুষের প্রত্যাশা ছিল হিমালয়-সমান, যেখানে তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছিল। এই আন্দোলনের মূলে ছিল তিনটি প্রধান আকাঙ্ক্ষা—জাতীয় ঐক্যের দৃঢ়তা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা।

ইতিহাস নির্মোহভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান করবে। তাদের সাফল্যের মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বড় কোনো বিপর্যয় এড়ানো এবং নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। তবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ভিত্তি হিসেবে জাতীয় ঐক্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে তারা আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং কতিপয় উপদেষ্টার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিকে বেশি মনোযোগী ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের অংশীদারিত্বের চেয়ে আমলাতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বিদেশিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা সরকারের গতিশীলতা ব্যাহত করেছে।

জুলাইয়ের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষা ক্রমে ‘সংস্কার’ নামক প্রশাসনিক শব্দে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, যা কিছু বিশেষজ্ঞ ও ‘যমুনা’র ঘেরাটোপে আটকা পড়েছিল। এছাড়া আন্দোলনের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক এবং তরুণদের বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়ার ফলে তাদের ক্ষমতায়নের পরিবর্তে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি হলেও, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান ও বৈষম্য দূর করার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো অন্তরালেই থেকে গেছে।

বর্তমানে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তবে তাদের শাসনকালের মাত্র কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ায় চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। সংসদ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চালু হওয়া এবং বিরোধী দলের অংশগ্রহণ স্বাভাবিকতার লক্ষণ হলেও, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে। এক্ষেত্রে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে ‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে বসানোই হবে পরিবর্তনের বড় পরীক্ষা।

শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা এবং তরুণদের শিক্ষামুখিতা হ্রাস পাওয়া বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। এছাড়া হামে কয়েক শ শিশুর মৃত্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনীয় বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে প্রশ্ন নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণের পরিসর কিছুটা সীমিত করেছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২-এর ঘরে নেমে আসা এবং তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

পরিশেষে, জুলাইয়ের মূল্যায়নে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, সমাজের সক্রিয়তা ও আত্মবিশ্বাস কতটা ধরে রাখা গেল তা গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক উদ্যোগ, স্থানীয় পর্যায়ের পরিবর্তনের চেষ্টা এবং সব ধরনের বিভাজন কাটিয়ে জাতীয় ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা টিকিয়ে রাখা জরুরি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা—ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা—সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজসহ প্রতে৵ক নাগরিকের।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo