জুলাই আন্দোলনে চিকিৎসকদের অবদান ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি
- আপডেট সময় : ১১:০৪:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

অগ্নিঝরা জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনে চিকিৎসকদের অনন্য ভূমিকা ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। রবিবার ডকটরস রেজিস্ট্যান্স ডে বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে এবং প্ল্যাটফর্ম অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটির সহযোগিতায় আয়োজিত “অগ্নিঝরা জুলাইয়ে চিকিৎসকদের অবদান” শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এই দাবি তুলে ধরেন। তারা উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে অসংখ্য চিকিৎসক নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, এমনকি নানা ধরনের চাপ ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেও তারা দায়িত্ব পালন করেছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল ৩৬ দিনের নয়, এটি ১৭ বছরের সংগ্রামের ফসল। তিনি বলেন, জুলাইয়ের কৃতিত্ব ১৮ কোটি মানুষের এবং এই দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব হিসেবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। মন্ত্রী জানান, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ ও অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতি দিতে সরকার 'জুলাই অধিদপ্তর' গঠন করেছে। এখনো অনেক জুলাইযোদ্ধা স্বীকৃতির আওতায় আসেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। একইসঙ্গে গত ১৭ বছরের আন্দোলনে গুম ও হত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ ও যথাযথ মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে যারা সাহস করে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, তাদের যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া দুঃখজনক। তিনি বলেন, পেশাগত শপথ ভঙ্গ করে যারা আহতদের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করেছেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। তিনি নিজে জুলাইয়ে আহত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, চিকিৎসকরা নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের সেবা দিয়েছেন, যা নতুন বাংলাদেশের আদর্শ হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন এবং সরকার চিকিৎসকদের অবদানের স্বীকৃতিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
অধ্যাপক যাকারিয়া আল আজিজ বলেন, জুলাইয়ে চিকিৎসকরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন—একদল আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, অন্যদল গণহত্যার পক্ষে শান্তি সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতাকারীদের বিচারের দাবি জানান। অধ্যাপক মাযহার শাহীন বলেন, জুলাই ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের যুদ্ধের কমান্ডার হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াকে চিহ্নিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, জুলাই কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি সকল জনগণের।
ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০২৪ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনসহ এমন কোনো গণআন্দোলন নেই, যেখানে চিকিৎসকদের অবদান ছিল না। তিনি জুলাইয়ের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি বা দখলদারিত্বের সুযোগ না দেওয়ার আহ্বান জানান। বিএনপির সহ-পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রফিকুল কবির লাবু বলেন, জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি না করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ১৭ বছরের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জুলাইয়ের পূর্ণতা এসেছে এবং বিবেকের তাড়নায় আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম। সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাহেদ আলম বলেন, চিকিৎসকদের অবদান শুধু জুলাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তাদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত।
অনুষ্ঠানে শহীদ ডা. মো. কবিরুল ইসলামের সহধর্মিণী শামসুন নাহার শেলী উপস্থিত ছিলেন। শহীদ ডা. সজীব সরকারের বাবা হালিম সরকার বকুল আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, তার ছেলে সজীব ১৮ জুলাই নরসিংদী থেকে ঢাকায় এসে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তিনি শহীদ সজীবের অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলামের সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং নরসিংদী মেডিকেল কলেজ শহীদ ডা. সজীব সরকারের নামে নামকরণের অনুরোধ জানান।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মো. রফিকূল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরিতে দীর্ঘ ১৫ বছরের ত্যাগ রয়েছে। তিনি বলেন, ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, জনি থেকে শুরু করে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে নতুন বাংলাদেশের পথ তৈরি করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা আজও যথাযথভাবে মূল্যায়িত নন এবং অনেকে পদায়ন ও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত। বক্তারা জুলাইয়ের আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীদের অবদান নথিবদ্ধ করা, শহীদ ও নির্যাতিত চিকিৎসকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান, জুলাইয়ের চিকিৎসকদের ভূমিকা ইতিহাসে সংরক্ষণ এবং বঞ্চিত চিকিৎসকদের ন্যায়সঙ্গত পদায়নের দাবি জানান।


























