উমবের্তো একোর ‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর’ ও সাহিত্য দর্শন
- আপডেট সময় : ০১:৪২:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

ইতালীয় লেখক উমবের্তো একোর (১৯৩২–২০১৬) তৃতীয় উপন্যাস ‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর’ বাস্তবতার প্রকৃতি, মানুষের পরিচয় এবং ভাষা ও চিহ্নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক দীর্ঘ দার্শনিক অনুসন্ধান। একো এই উপন্যাসে দেখাতে চেয়েছেন, আমরা যাকে বাস্তবতা বলে মনে করি, তার অনেকটাই আসলে মানুষের তৈরি ধারণা। ভাষা, প্রতীক ও রূপক অনেক সময় আমাদের সত্যের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে বিভ্রান্ত করে। ১৭ শতকের এক অভিজাত যুবক রবার্তো দে লা গ্রিভার লেখা চিঠির আকারে নির্মিত এই উপন্যাসে, রবার্তো একটি পরিত্যক্ত জাহাজ ‘ড্যাফনি’-তে আটকা পড়ে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় একটি রহস্যময় দ্বীপের কাছে নোঙর করা জাহাজটিতে কোনো মানুষ না থাকায় রবার্তো তার অবস্থান নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয় এবং একাকিত্বের চোরাবালিতে দর্শন ও কল্পনার জগতে নিজেকে ডুবিয়ে দেয়।
উপন্যাসটি কেবল রবার্তোর বর্তমান নিঃসঙ্গতার গল্প নয়, বরং তার অতীত স্মৃতির এক জটিল জাল। কিশোর বয়সে ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সময় ক্যাসালের অবরোধ থেকে বেঁচে ফেরা রবার্তোর জীবনে তার সৎভাই ফেরান্তে এক ছায়ার মতো জড়িয়ে থাকে। ফেরান্তের সঙ্গে রবার্তোর চেহারার মিল এবং ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা তার জীবনকে অস্থির করে তোলে। পরবর্তীতে কার্ডিনাল মাজাঁরিনের নির্দেশে সমুদ্রে দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়ের ‘স্থির বিন্দু’ খোঁজার মিশনে গিয়ে রবার্তো ড্যাফনি জাহাজে পৌঁছায়। জার্মান যাজক ফাদার ক্যাসপার ওয়ান্ডারড্রসেলের সঙ্গে তার দার্শনিক বিতর্ক বাস্তবতা ও কল্পনার পার্থক্যকে আরও অস্পষ্ট করে তোলে। উপন্যাসে একজন অজ্ঞাতনামা বর্ণনাকারীর হস্তক্ষেপ রবার্তোর বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং গল্প তৈরির প্রক্রিয়াটিকেই এক ধরনের খেলায় পরিণত করে।
‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর’ উপন্যাসে রবিনসন ক্রসো বা গালিভার ট্রাভেলসের মতো চিরায়ত সাহিত্যের আবহ থাকলেও, একো একে ১৭ শতকের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে এক বিশাল জ্ঞানভিত্তিক কোলাজ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। রবার্তোর সব চিন্তা শেষ পর্যন্ত তার প্রিয় নারী লিলিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়, যা বাস্তবতার চেয়েও মানুষের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে বড় করে তোলে। একো দেখিয়েছেন, মানুষ নিজের জীবনের লেখক নিজে এবং আমাদের চারপাশের সংস্কৃতি অসংখ্য চিহ্ন ও গল্পের সমন্বয়ে তৈরি।
উমবের্তো একো তার সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে জেসিকা জার্নিগানের নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গল্প বলার ক্ষমতাকে মানুষের সহজাত স্বভাব হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, তার গবেষণামূলক কাজ এবং উপন্যাস লেখা একে অপরের পরিপূরক। সেমিওটিকস বা চিহ্নতত্ত্বের গবেষক হিসেবে তিনি মানুষের যোগাযোগ ও চিহ্নের ভিত্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। হলি গ্রেইলকে তিনি অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার রূপক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বাবেল টাওয়ারের পর মানুষের ভাষা বিভাজিত হলেও, বউদোলিনোর মতো চরিত্রের মাধ্যমে তিনি সব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সেই আদি স্বপ্ন ও ভিন্ন ভিন্ন ভাষার বৈচিত্র্যময় গল্প বলার প্রয়োজনীয়তাকে উদ্যাপন করেছেন। অনুবাদ প্রসঙ্গে একো জানান, দক্ষ অনুবাদকের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে তিনি তার লেখার মূল ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তার উপন্যাসগুলোতে গোপন ইঙ্গিত বা উদ্ধৃতি থাকা সত্ত্বেও, সেগুলোর সৌন্দর্য পাঠকের কাছে অম্লান থাকে বলেই তিনি মনে করেন।




























