ঢাকা ০৩:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পাবনায় ৪০ বোতল ফেনসিডিল মামলায় যুবকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সলঙ্গায় স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাদক ও ইভটিজিং বিরোধী মতবিনিময় ভোলার বোরহানউদ্দিনে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে নারীর স্বর্ণের দুল ছিনতাই স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধে তালাক বা মৃত্যুর অপেক্ষা নয়: হাইকোর্ট টাঙ্গাইলে বৃদ্ধা হত্যায় যুবকের মৃত্যুদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা জামদানি শাড়িতে মোহনীয় পূর্ণিমা, মুগ্ধ ভক্তরা দেশের জেলা স্টেডিয়ামগুলো আধুনিকায়নে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার চাটমোহরে খাসজমি থেকে ভূমিহীন নারীকে উচ্ছেদের চেষ্টার অভিযোগ সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানি বন্ধে সম্পাদক পরিষদের দাবি সাইবার আইনের নামে কণ্ঠ রোধের চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না: ফুয়াদ

ধ্বংসের মুখে ঝালকাঠির ঐতিহাসিক কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৮:৩৪:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



অষ্টাদশ শতাব্দীর সমাজব্যবস্থা, কুসংস্কার এবং এক কিশোরী বধূর মর্মান্তিক আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন এই স্থাপনাটি বর্তমানে দীর্ঘদিনের অবহেলা, সংস্কারের অভাব ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিক্রমপুর পোড়াগাছার রাজা কৃষ্ণ রাম সেনগুপ্ত ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বনভূমি ও জলাশয়ের বন্দোবস্ত নিয়ে এই জমিদারির পত্তন করেন। পরবর্তীতে তার দুই পুত্র কৃষ্ণ কুমার সেনগুপ্ত ও দেবীচরণ সেনগুপ্তের জন্য দুটি পৃথক ভবন নির্মাণ করা হয়, যা যথাক্রমে ‘দশ আনা বড় হিস্যা’ ও ‘ছয় আনা ছোট হিস্যা’ জমিদার বাড়ি নামে পরিচিতি পায়।

এই জমিদার বাড়ির ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে হরসুন্দরী দেবীর করুণ কাহিনী। দেবীচরণের প্রপৌত্র কালী প্রসন্ন কুমার সেনগুপ্ত ১৮২৮ সালে পারিবারিক বিরোধের জেরে মাত্র ২২ বছর বয়সে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ওই সময় পরিবারের সদস্যরা তার ১৬ বছর বয়সী স্ত্রী হরসুন্দরী দেবীর বিরুদ্ধে বিষপ্রয়োগের অভিযোগ তোলেন। হরসুন্দরী নিজেকে বারবার নির্দোষ দাবি করলেও পরিবারের কেউ তা বিশ্বাস করেনি। অপবাদ ও অবিশ্বাসের যন্ত্রণা সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেন।

হরসুন্দরীর এই সহমরণের ঘটনা তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর সূত্র ধরেই ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে আইন করে সতীদাহ প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ইতিহাসে এই অঞ্চলের আর কোনো সতীদাহের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না।

কালের বিবর্তনে ছোট হিস্যা জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে গেলেও বড় হিস্যা অংশের নাটমন্দির, হলঘর ও ছোট একটি মন্দির এখনো টিকে আছে। বর্তমানে এই জমিদার বাড়ির চত্বরে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে মূল অংশের একটিতে প্রসন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং নাটমঞ্চ ও হলঘরে কমলিকন্দ নবীন চন্দ্র বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ভবন ও দুর্গামন্দির লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের অধিকাংশ দরজা-জানালা ভাঙা এবং দেয়ালের ইট ও প্লাস্টার খসে পড়ছে। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির পরিচয় বহনকারী কোনো সাইনবোর্ডও সেখানে নেই। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের আন্দোলনের মুখে জেলা প্রশাসন হরসুন্দরীর সহমরণের চিতা স্থলটি ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাই করলেও বর্তমানে সেটিরও কোনো দেখভাল করা হয় না।

স্থানীয় বাসিন্দা বিমল চন্দ্র দে বলেন, কীর্তিপাশা জমিদার বাড়িটি কেবল ইটের স্তূপ নয়, এটি আমাদের স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক বিরাট অংশ। প্রতিদিন বহু মানুষ হরসুন্দরীর স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানটি দেখতে এলেও জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে হতাশ হন। দ্রুত সংস্কার করা না হলে পরবর্তী প্রজন্ম এই ইতিহাস ভুলতে বসবে। বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ঝালকাঠি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অলোক সাহা জানান, ঐতিহ্যবাহী এই জমিদার বাড়িটি হিন্দু সম্প্রদায়ের আবেগ ও এই অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তিনি সরকারকে দ্রুত এটিকে সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

নিউজটি শেয়ার করুন

ধ্বংসের মুখে ঝালকাঠির ঐতিহাসিক কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি

আপডেট সময় : ০৮:৩৪:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

অষ্টাদশ শতাব্দীর সমাজব্যবস্থা, কুসংস্কার এবং এক কিশোরী বধূর মর্মান্তিক আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন এই স্থাপনাটি বর্তমানে দীর্ঘদিনের অবহেলা, সংস্কারের অভাব ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিক্রমপুর পোড়াগাছার রাজা কৃষ্ণ রাম সেনগুপ্ত ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বনভূমি ও জলাশয়ের বন্দোবস্ত নিয়ে এই জমিদারির পত্তন করেন। পরবর্তীতে তার দুই পুত্র কৃষ্ণ কুমার সেনগুপ্ত ও দেবীচরণ সেনগুপ্তের জন্য দুটি পৃথক ভবন নির্মাণ করা হয়, যা যথাক্রমে ‘দশ আনা বড় হিস্যা’ ও ‘ছয় আনা ছোট হিস্যা’ জমিদার বাড়ি নামে পরিচিতি পায়।

এই জমিদার বাড়ির ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে হরসুন্দরী দেবীর করুণ কাহিনী। দেবীচরণের প্রপৌত্র কালী প্রসন্ন কুমার সেনগুপ্ত ১৮২৮ সালে পারিবারিক বিরোধের জেরে মাত্র ২২ বছর বয়সে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ওই সময় পরিবারের সদস্যরা তার ১৬ বছর বয়সী স্ত্রী হরসুন্দরী দেবীর বিরুদ্ধে বিষপ্রয়োগের অভিযোগ তোলেন। হরসুন্দরী নিজেকে বারবার নির্দোষ দাবি করলেও পরিবারের কেউ তা বিশ্বাস করেনি। অপবাদ ও অবিশ্বাসের যন্ত্রণা সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেন।

হরসুন্দরীর এই সহমরণের ঘটনা তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর সূত্র ধরেই ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে আইন করে সতীদাহ প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ইতিহাসে এই অঞ্চলের আর কোনো সতীদাহের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না।

কালের বিবর্তনে ছোট হিস্যা জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে গেলেও বড় হিস্যা অংশের নাটমন্দির, হলঘর ও ছোট একটি মন্দির এখনো টিকে আছে। বর্তমানে এই জমিদার বাড়ির চত্বরে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে মূল অংশের একটিতে প্রসন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং নাটমঞ্চ ও হলঘরে কমলিকন্দ নবীন চন্দ্র বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ভবন ও দুর্গামন্দির লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের অধিকাংশ দরজা-জানালা ভাঙা এবং দেয়ালের ইট ও প্লাস্টার খসে পড়ছে। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির পরিচয় বহনকারী কোনো সাইনবোর্ডও সেখানে নেই। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের আন্দোলনের মুখে জেলা প্রশাসন হরসুন্দরীর সহমরণের চিতা স্থলটি ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাই করলেও বর্তমানে সেটিরও কোনো দেখভাল করা হয় না।

স্থানীয় বাসিন্দা বিমল চন্দ্র দে বলেন, কীর্তিপাশা জমিদার বাড়িটি কেবল ইটের স্তূপ নয়, এটি আমাদের স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক বিরাট অংশ। প্রতিদিন বহু মানুষ হরসুন্দরীর স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানটি দেখতে এলেও জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে হতাশ হন। দ্রুত সংস্কার করা না হলে পরবর্তী প্রজন্ম এই ইতিহাস ভুলতে বসবে। বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ঝালকাঠি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অলোক সাহা জানান, ঐতিহ্যবাহী এই জমিদার বাড়িটি হিন্দু সম্প্রদায়ের আবেগ ও এই অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তিনি সরকারকে দ্রুত এটিকে সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin