স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধে তালাক বা মৃত্যুর অপেক্ষা নয়: হাইকোর্ট
- আপডেট সময় : ০২:৫৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

স্ত্রীকে দেনমোহর দেওয়ার জন্য তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর আগপর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, দেনমোহর স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাওনা এবং এটি অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে। ‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ নামের একটি দেওয়ানি রিভিশন মামলায় বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দেনমোহর পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনো স্বামী যদি তা দিতে বিলম্ব করেন এবং স্ত্রীকে এ জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়, তবে বিচারিক আদালত স্বামীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরার আয়াত উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, মোহর স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র ও আর্থিক অধিকার, যা বিয়ে বন্ধনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। স্বামী কোনোভাবেই এই অর্থ ফেরত দাবি করতে পারেন না। তবে স্ত্রী যদি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে এবং কোনো ধরনের জবরদস্তি বা প্রতারণা ছাড়া দেনমোহর মওকুফ করেন, কেবল তখনই তা গ্রহণযোগ্য হবে।
আইনজীবীদের বরাত দিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, ইসলামি আইন ও ঘটনার ওপর ভিত্তি করে আদালতেরও দেনমোহরের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার বা মওকুফ করার কোনো আইনি এখতিয়ার নেই। তবে স্ত্রী চাইলে স্বাধীনভাবে তাঁর দেনমোহরের পুরোটা বা আংশিক অংশ মওকুফ করতে পারেন। কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন ও দ্ব্যর্থহীন হতে হবে; কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাবের মুখে আদায় করা মওকুফ আইনত বৈধ নয়।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে এই দম্পতির বিয়ে হয়েছিল। তাঁদের ঘরে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণ চেয়ে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন স্ত্রী। স্বামী আদালতে উপস্থিত না থাকায় ২০২২ সালের ৫ মে আদালত একতরফা ডিক্রি দেন। রায়ে স্ত্রীকে ১৮ লাখ টাকা দেনমোহর, ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং সন্তানের বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা মিলিয়ে মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া মেয়ের বিয়ের আগপর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বামী অধস্তন আদালতে আপিল করলেও ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট তা খারিজ হয়ে যায়। এরপর তিনি হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করে দাবি করেন যে, ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তিনি আর্থিক সংকটে আছেন এবং দেনমোহরের টাকা কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চান। হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি করলেও চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৩ সেপ্টেম্বর তা খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে বকেয়া দেনমোহর ও অপ্রাপ্তবাইন্য মেয়ের ভরণপোষণের সব পাওনা পরিশোধ করে ডিক্রি বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন আদালত।
হাইকোর্টে স্ত্রীর পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, দেনমোহর কমানোর কোনো এখতিয়ার হাইকোর্টেরও নেই। মামলা করতে গিয়ে নারীদের অনেক অর্থ ও সময় ব্যয় হয়। সামর্থ্য থাকার পরও স্বামী যদি দেনমোহর দিতে হয়রানি করেন, তবে আদালত এখন থেকে স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারবেন। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এই বিষয়টি সম্পূর্ণ নতুন এবং এর ফলে দেনমোহর নিয়ে নারীদের হয়রানি কমবে এবং মামলা দীর্ঘায়িত করার চেয়ে আপস-মীমাংসার প্রবণতা বাড়বে।




























