ঢাকা ০৬:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নেশন্স লিগে জয়রথ অব্যাহত স্পেন ও ইংল্যান্ডের মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়, আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না স্কালোনি বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্কের দিকে নজর ভারতের: রণধীর জয়সোয়াল তৈরি পোশাকশ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়, অবসরের পর কেমন কাটবে মেসির সময়? জেট ফুয়েলের নতুন দাম ঘোষণা করল বিইআরসি ঢাবি লাইব্রেরি চত্বরে গণরুম নিপীড়নের স্মৃতিস্তম্ভ ‘আর্তনাদ’ উদ্বোধন একনেকে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নিয়ে ঈশ্বরগঞ্জে নারী আটক পানির হিস্যায় ভারতকে এক চুলও ছাড় দেওয়া হবে না: নাহিদ ইসলাম

শৈশব হারিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে গাজার হাজারো অনাথ শিশু

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৩:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিনের সংঘাত ও বোমাবর্ষণে শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পরিবেশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে গাজার শিশুরা ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি এবং স্বজন হারানোর গভীর ক্ষত নিয়ে বড় হচ্ছে। ২০২৬ সালের জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের অনেককে একাধিকবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয়েছে। এছাড়া গৃহহীন হয়েছেন ১২ লাখেরও বেশি মানুষ।

এই চরম সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিশুরা। জাতিসংঘ শিশু তহবিল বা ইউনিসেফের হিসাব মতে, গাজায় বর্তমানে প্রায় ১৯ হাজার শিশু সম্পূর্ণ একা বা অনাথ হয়ে পড়েছে। এদের কেউ মা-বাবা উভয়কে হারিয়েছে, আবার কারও অভিভাবক নিখোঁজ রয়েছেন। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে সীমান্তবিহীন চিকিৎসক সংস্থা (এমএসএফ) এই শিশুদের বোঝাতে 'ডব্লিউসিএনএসএফ' (WCNSF) বা 'আহত শিশু, যার কোনো পরিবার বেঁচে নেই' পরিভাষাটি ব্যবহার শুরু করে।

শারীরিক ও মানসিক আঘাতের চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ৫ হাজারের বেশি মানুষের অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছে, যার প্রতি পাঁচজনের একজন শিশু। এছাড়া প্রায় ৫৬ হাজার আহত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই এমএসএফের চিকিৎসকেরা সহিংসতায় দগ্ধ, গুলিবিদ্ধ ও বিস্ফোরণে আহত ৫৬৭ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন। অথচ এই সময়ে গাজার অর্ধেকের বেশি hospital বা চিকিৎসাকেন্দ্র অকার্যকর অবস্থায় ছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও সংকট কাটেনি। অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে মৌলিক চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ওডিআই বা জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের (OCHA) তথ্য অনুযায়ী, ৯১ শতাংশ পরিবার মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার পানি-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় নিয়ে সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, গাজার শিশুরা এখন আর স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারছে না। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংস্থাটি জানায়, শিশুরা এখন লুকোচুরির বদলে যুদ্ধের খেলা খেলছে—যেখানে তারা একে অপরকে গুলি করার ভান করে, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিনয় করে কিংবা পুতুলের জানাজা দেয়। একইভাবে ওয়ার চাইল্ড ২০২৪ সালে ৫০৪টি পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে শিশুদের গভীর মানসিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে।

১৪ বছর বয়সী সালমা এমনই এক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সে কোনোমতে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে মিসরে পালিয়ে যেতে পারলেও যুদ্ধের আতঙ্ক তাকে তাড়া করে ফিরছে। সালমা জানায়, সামান্য জোরে শব্দ হলেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাসকষ্ট হয় এবং হাত ঘেমে যায়। মিসরের স্কুলে সহপাঠীদের মাঝে নিজেকে গুটিয়ে রাখে সে। সালমার বাবা আক্ষেপ করে বলেন, তাদের পরিবারের মানসিক শান্তি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। মা ও ভাইবোনদের হারানোর শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। তার ভাষায়, প্রতিটি দিনই তাদের জন্য সংগ্রাম। তাদের ভবনটি ধসে পড়ার দিনই যেন তারা সবাই মারা গেছে। এখন তারা শুধু জীবিত, কিন্তু মনে হয় মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।

এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) গাজার শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক সহায়তা দিতে কাজ করছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটির সমাজসেবা দল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৯৮ জন বাস্তুচ্যুত মানুষকে মানসিক ও সামাজিক সেবা দিয়েছে। মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জেমস গর্ডন, যিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে গাজায় কাজ করছেন, মনে করেন যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও মানুষ আবার নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন একটি নিরাপদ ও স্থায়ী পরিবেশ, রাতে ঘুমানোর জায়গা, আশ্বস্ত করার মতো অভিভাবক এবং নিয়মিত স্কুলের ছন্দ। গাজার শিশুদের সুস্থতার জন্য এখন কেবল মানসিক পরামর্শই নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে তারা আবার নিরাপদ বোধ করতে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

নিউজটি শেয়ার করুন

শৈশব হারিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে গাজার হাজারো অনাথ শিশু

আপডেট সময় : ০৫:৩৩:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিনের সংঘাত ও বোমাবর্ষণে শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পরিবেশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে গাজার শিশুরা ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি এবং স্বজন হারানোর গভীর ক্ষত নিয়ে বড় হচ্ছে। ২০২৬ সালের জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের অনেককে একাধিকবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয়েছে। এছাড়া গৃহহীন হয়েছেন ১২ লাখেরও বেশি মানুষ।

এই চরম সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিশুরা। জাতিসংঘ শিশু তহবিল বা ইউনিসেফের হিসাব মতে, গাজায় বর্তমানে প্রায় ১৯ হাজার শিশু সম্পূর্ণ একা বা অনাথ হয়ে পড়েছে। এদের কেউ মা-বাবা উভয়কে হারিয়েছে, আবার কারও অভিভাবক নিখোঁজ রয়েছেন। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে সীমান্তবিহীন চিকিৎসক সংস্থা (এমএসএফ) এই শিশুদের বোঝাতে 'ডব্লিউসিএনএসএফ' (WCNSF) বা 'আহত শিশু, যার কোনো পরিবার বেঁচে নেই' পরিভাষাটি ব্যবহার শুরু করে।

শারীরিক ও মানসিক আঘাতের চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ৫ হাজারের বেশি মানুষের অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছে, যার প্রতি পাঁচজনের একজন শিশু। এছাড়া প্রায় ৫৬ হাজার আহত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই এমএসএফের চিকিৎসকেরা সহিংসতায় দগ্ধ, গুলিবিদ্ধ ও বিস্ফোরণে আহত ৫৬৭ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন। অথচ এই সময়ে গাজার অর্ধেকের বেশি hospital বা চিকিৎসাকেন্দ্র অকার্যকর অবস্থায় ছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও সংকট কাটেনি। অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে মৌলিক চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ওডিআই বা জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের (OCHA) তথ্য অনুযায়ী, ৯১ শতাংশ পরিবার মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার পানি-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় নিয়ে সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, গাজার শিশুরা এখন আর স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারছে না। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংস্থাটি জানায়, শিশুরা এখন লুকোচুরির বদলে যুদ্ধের খেলা খেলছে—যেখানে তারা একে অপরকে গুলি করার ভান করে, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিনয় করে কিংবা পুতুলের জানাজা দেয়। একইভাবে ওয়ার চাইল্ড ২০২৪ সালে ৫০৪টি পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে শিশুদের গভীর মানসিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে।

১৪ বছর বয়সী সালমা এমনই এক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সে কোনোমতে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে মিসরে পালিয়ে যেতে পারলেও যুদ্ধের আতঙ্ক তাকে তাড়া করে ফিরছে। সালমা জানায়, সামান্য জোরে শব্দ হলেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাসকষ্ট হয় এবং হাত ঘেমে যায়। মিসরের স্কুলে সহপাঠীদের মাঝে নিজেকে গুটিয়ে রাখে সে। সালমার বাবা আক্ষেপ করে বলেন, তাদের পরিবারের মানসিক শান্তি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। মা ও ভাইবোনদের হারানোর শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। তার ভাষায়, প্রতিটি দিনই তাদের জন্য সংগ্রাম। তাদের ভবনটি ধসে পড়ার দিনই যেন তারা সবাই মারা গেছে। এখন তারা শুধু জীবিত, কিন্তু মনে হয় মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।

এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) গাজার শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক সহায়তা দিতে কাজ করছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটির সমাজসেবা দল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৯৮ জন বাস্তুচ্যুত মানুষকে মানসিক ও সামাজিক সেবা দিয়েছে। মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জেমস গর্ডন, যিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে গাজায় কাজ করছেন, মনে করেন যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও মানুষ আবার নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন একটি নিরাপদ ও স্থায়ী পরিবেশ, রাতে ঘুমানোর জায়গা, আশ্বস্ত করার মতো অভিভাবক এবং নিয়মিত স্কুলের ছন্দ। গাজার শিশুদের সুস্থতার জন্য এখন কেবল মানসিক পরামর্শই নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে তারা আবার নিরাপদ বোধ করতে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin