ঢাকা ০৫:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
১৬ বছর বয়সে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়লেন লক্ষ্মণন বেলজিয়ামে নালা খননের সময় মিলল ১২৭ কোটি টাকার স্বর্ণ চলতি অর্থবছরে কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে সৌদি আরবের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভাবনীয় সাফল্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফশিল স্থগিত ও ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ মঙ্গলবার জাতিসংঘের আল-কায়েদা রিপোর্ট অনুমাননির্ভর, গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার কালীগঞ্জে ৮০ স্কুলে নেই নৈশপ্রহরী, দেওতলা বিদ্যালয়ে দেড় লাখের চুরি ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে এডিবির সহযোগিতা রাজধানীতে বিআরটিসির বিশেষ মহিলা বাস সার্ভিসের উদ্বোধন কাল শিগগিরই গঠিত হচ্ছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন

বিএনপি কি সরকারে মিশে যাচ্ছে? মাঠের চিত্র নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৫৪:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ঢাকায় এলেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের বাসায় একবার ঢুঁ মারেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আমানউল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাহরুল আলম। ব্যবসা, চিকিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত কাজ—যে কারণেই রাজধানীতে আসুন, এমপির সঙ্গে দেখা করা তাঁর অন্যতম কাজ। গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিএনপির সমর্থনে জয়ী হওয়া এই চেয়ারম্যান এবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। তাই নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. বরকতউল্লা বুলুর সমর্থন নিশ্চিত করা তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতার বড় অংশ। গত শনিবার রাতে তিনি নিঃসংকোচে জানান, এমপি এলাকায় এলে বা তিনি ঢাকায় গেলে নিয়মিত দেখা করেন।

শুধু বাহরুল আলম নন, বিএনপির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যস্ততার চিত্রও এমন। ঢাকায় এসে এমপি-মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করা, নিজের অবস্থান জানান দেওয়া এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ খুঁজছেন, সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরছেন বা সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রায় ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা দলটির নেতা-কর্মীদের একটি অংশ সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে বিএনপির সামনে এখন বড় সাংগঠনিক প্রশ্ন—দল সরকারকে সহযোগিতা করবে, নাকি ধীরে ধীরে সরকারের ছায়ায় আড়াল হয়ে যাবে?

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বিএনপির সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দীর্ঘদিনের সংগঠনকে সক্রিয় রাখা। ছয় মাস পূর্তির সময় দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততায় দলীয় রাজনীতি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। দলের নেতারাই স্বীকার করছেন, এ সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল সীমিত। দিবসভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে মাঠে দলটির তৎপরতা খুব একটা দেখা যায়নি। এর কিছু বাস্তব কারণও আছে। বিএনপির মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একটি বড় অংশ এখন সংসদ সদস্য, অনেকে মন্ত্রী। জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বেও আছেন দলের নেতারা। ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, দল যখন সরকারে যায়, তখন দল সরকারের কার্যক্রমে সহযোগিতা করে। তার মানে এই নয় যে দল সরকারে ঢুকে গেছে। তবে সরকার গঠনের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢেলে সাজাতে পারিনি, এটা সত্য। এখন আমরা অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠনসহ দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক এমরান সালেহ প্রিন্স সরকারে দল মিশে যাওয়ার ঝুঁকি অস্বীকার করেন না। তিনি বলেন, যাঁরা নেতা, তাঁরাই তো এমপি-মন্ত্রী। আবার অনেকে স্থানীয় সরকারে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। সে কারণে সরকারের কর্মকাণ্ডগুলো বুঝে নিতে একটু সময় লেগেছে। তবে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে খুব সতর্ক। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানে বলছেন সরকারের কাজে দলের সহযোগিতা লাগবে, কিন্তু সরকারের ভেতরে দলকে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে না।

সরকারের ভাষ্য, প্রথম ছয় মাস ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো সচল করা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতির সময়। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেয়। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে থাকা পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানীসহ কয়েকটি কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। এপ্রিলে কৃষক কার্ডের প্রাক্-পাইলট কর্মসূচি চালু করে প্রাথমিকভাবে ২২ হাজারের বেশি কৃষকের কাছে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়। জুনে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়েছে। গণমাধ্যমের ওপরও আগের মতো চাপ দেখা যাচ্ছে না। সংবাদপত্র সরকারের সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। নাগরিক সমাজও বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনভাবে মত দিচ্ছে। সেদিক থেকে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে তুলনামূলক স্বস্তি আছে। বর্তমান সরকারের ছয় মাসে বিরোধী দল ও মতের ওপর আগের মতো রাজনৈতিক নিপীড়নের চিত্র দেখা যায়নি। বিরোধী দলগুলো সরকার, ক্ষমতাসীন দল ও এর নেতাদের সমালোচনা করছে; প্রকাশ্যে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যও তুলে ধরছে।

তবে সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে সংস্কার একটি বড় অস্বস্তির জায়গা। গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। বিএনপিও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর কোন সংস্কার দ্রুত করবে, কোনটি পরে করবে এবং কোনটির জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন—এ নিয়ে দলটির অবস্থানের সমালোচনা করছে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য প্রশ্নটি শুধু সংস্কার বাস্তবায়নের নয়, গণ-অভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরকারের আচরণের দূরত্ব কতটা, সেই উত্তর দেওয়ারও। সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শক্তিরও ঘাটতি নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সরকারের ইচ্ছা ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে সংস্কার কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্ব, কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সর্বশেষ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়োগ দেওয়াকে কেউ কেউ দলীয় নেতাদের ‘পুনর্বাসন’ হিসেবে সমালোচনা করছেন। যদিও বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এরা কিন্তু কেউ অযোগ্য না। সব যোগ্যতা তাদের মধ্যে আছে। আমি সরকারে, আমার লোকজন থাকবে না?

অর্থনীতি ও জনজীবনের চাপও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব আদায়ের চাপের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের সমস্যাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতি এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট শিল্পকারখানার উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে চাপ তৈরি করছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় অংশ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট ও বাজারের চাপ সরকারের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের পর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সরকারে দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে রুহুল কবির রিজভীসহ চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ছয় মাস পূর্তির সময় দলকে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ৪ জুলাই থেকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা জেলা এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে তৃণমূলে দলকে শক্তিশালী করা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, বিএনপি মাঠে নেই, বিষয়টা এমন নয়। প্রধানমন্ত্রী যখন চট্টগ্রামে আসেন, তখন নেতা-কর্মীরা ব্যাপকভাবে মাঠে ছিলেন। আমি যতটুকু জানি, খুব শিগগির বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হবে। সাংগঠনিকভাবে অঙ্গসংগঠনসহ বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই নিতে হবে; আবার দলের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাবও পড়বে সরকারের ওপর। তাই ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে নেতা-কর্মীদের ব্যস্ততার বিপরীতে দলকে মাঠে সক্রিয় রাখাই এখন বিএনপির বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

একই সময়ে সংস্কার ও নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, অর্থনৈতিক চাপ, বিদ্যুৎ–জ্বালানিসংকট এবং দলের সাংগঠনিক স্থবিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিদ্যুৎ-সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উগ্রবাদী তৎপরতা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

বিএনপি কি সরকারে মিশে যাচ্ছে? মাঠের চিত্র নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

আপডেট সময় : ০১:৫৪:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

ঢাকায় এলেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের বাসায় একবার ঢুঁ মারেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আমানউল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাহরুল আলম। ব্যবসা, চিকিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত কাজ—যে কারণেই রাজধানীতে আসুন, এমপির সঙ্গে দেখা করা তাঁর অন্যতম কাজ। গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিএনপির সমর্থনে জয়ী হওয়া এই চেয়ারম্যান এবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। তাই নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. বরকতউল্লা বুলুর সমর্থন নিশ্চিত করা তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতার বড় অংশ। গত শনিবার রাতে তিনি নিঃসংকোচে জানান, এমপি এলাকায় এলে বা তিনি ঢাকায় গেলে নিয়মিত দেখা করেন।

শুধু বাহরুল আলম নন, বিএনপির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যস্ততার চিত্রও এমন। ঢাকায় এসে এমপি-মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করা, নিজের অবস্থান জানান দেওয়া এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ খুঁজছেন, সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরছেন বা সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রায় ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা দলটির নেতা-কর্মীদের একটি অংশ সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে বিএনপির সামনে এখন বড় সাংগঠনিক প্রশ্ন—দল সরকারকে সহযোগিতা করবে, নাকি ধীরে ধীরে সরকারের ছায়ায় আড়াল হয়ে যাবে?

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বিএনপির সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দীর্ঘদিনের সংগঠনকে সক্রিয় রাখা। ছয় মাস পূর্তির সময় দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততায় দলীয় রাজনীতি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। দলের নেতারাই স্বীকার করছেন, এ সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল সীমিত। দিবসভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে মাঠে দলটির তৎপরতা খুব একটা দেখা যায়নি। এর কিছু বাস্তব কারণও আছে। বিএনপির মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একটি বড় অংশ এখন সংসদ সদস্য, অনেকে মন্ত্রী। জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বেও আছেন দলের নেতারা। ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, দল যখন সরকারে যায়, তখন দল সরকারের কার্যক্রমে সহযোগিতা করে। তার মানে এই নয় যে দল সরকারে ঢুকে গেছে। তবে সরকার গঠনের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢেলে সাজাতে পারিনি, এটা সত্য। এখন আমরা অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠনসহ দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক এমরান সালেহ প্রিন্স সরকারে দল মিশে যাওয়ার ঝুঁকি অস্বীকার করেন না। তিনি বলেন, যাঁরা নেতা, তাঁরাই তো এমপি-মন্ত্রী। আবার অনেকে স্থানীয় সরকারে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। সে কারণে সরকারের কর্মকাণ্ডগুলো বুঝে নিতে একটু সময় লেগেছে। তবে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে খুব সতর্ক। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানে বলছেন সরকারের কাজে দলের সহযোগিতা লাগবে, কিন্তু সরকারের ভেতরে দলকে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে না।

সরকারের ভাষ্য, প্রথম ছয় মাস ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো সচল করা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতির সময়। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেয়। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে থাকা পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানীসহ কয়েকটি কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। এপ্রিলে কৃষক কার্ডের প্রাক্-পাইলট কর্মসূচি চালু করে প্রাথমিকভাবে ২২ হাজারের বেশি কৃষকের কাছে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়। জুনে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়েছে। গণমাধ্যমের ওপরও আগের মতো চাপ দেখা যাচ্ছে না। সংবাদপত্র সরকারের সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। নাগরিক সমাজও বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনভাবে মত দিচ্ছে। সেদিক থেকে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে তুলনামূলক স্বস্তি আছে। বর্তমান সরকারের ছয় মাসে বিরোধী দল ও মতের ওপর আগের মতো রাজনৈতিক নিপীড়নের চিত্র দেখা যায়নি। বিরোধী দলগুলো সরকার, ক্ষমতাসীন দল ও এর নেতাদের সমালোচনা করছে; প্রকাশ্যে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যও তুলে ধরছে।

তবে সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে সংস্কার একটি বড় অস্বস্তির জায়গা। গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। বিএনপিও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর কোন সংস্কার দ্রুত করবে, কোনটি পরে করবে এবং কোনটির জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন—এ নিয়ে দলটির অবস্থানের সমালোচনা করছে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য প্রশ্নটি শুধু সংস্কার বাস্তবায়নের নয়, গণ-অভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরকারের আচরণের দূরত্ব কতটা, সেই উত্তর দেওয়ারও। সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শক্তিরও ঘাটতি নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সরকারের ইচ্ছা ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে সংস্কার কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্ব, কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সর্বশেষ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়োগ দেওয়াকে কেউ কেউ দলীয় নেতাদের ‘পুনর্বাসন’ হিসেবে সমালোচনা করছেন। যদিও বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এরা কিন্তু কেউ অযোগ্য না। সব যোগ্যতা তাদের মধ্যে আছে। আমি সরকারে, আমার লোকজন থাকবে না?

অর্থনীতি ও জনজীবনের চাপও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব আদায়ের চাপের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের সমস্যাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতি এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট শিল্পকারখানার উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে চাপ তৈরি করছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় অংশ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট ও বাজারের চাপ সরকারের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের পর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সরকারে দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে রুহুল কবির রিজভীসহ চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ছয় মাস পূর্তির সময় দলকে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ৪ জুলাই থেকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা জেলা এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে তৃণমূলে দলকে শক্তিশালী করা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, বিএনপি মাঠে নেই, বিষয়টা এমন নয়। প্রধানমন্ত্রী যখন চট্টগ্রামে আসেন, তখন নেতা-কর্মীরা ব্যাপকভাবে মাঠে ছিলেন। আমি যতটুকু জানি, খুব শিগগির বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হবে। সাংগঠনিকভাবে অঙ্গসংগঠনসহ বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই নিতে হবে; আবার দলের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাবও পড়বে সরকারের ওপর। তাই ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে নেতা-কর্মীদের ব্যস্ততার বিপরীতে দলকে মাঠে সক্রিয় রাখাই এখন বিএনপির বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

একই সময়ে সংস্কার ও নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, অর্থনৈতিক চাপ, বিদ্যুৎ–জ্বালানিসংকট এবং দলের সাংগঠনিক স্থবিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিদ্যুৎ-সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উগ্রবাদী তৎপরতা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo