এসএসসির ফল প্রকাশে বিলম্ব: শিক্ষার্থীদের বাড়ছে উদ্বেগ ও আত্মহত্যার ঝুঁকি

- আপডেট সময় : ০১:৩৪:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তায় চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে লাখ লাখ পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা। সাধারণত পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের নিয়ম থাকলেও এবার পূর্বঘোষিত তারিখ পরিবর্তন করে সময় বাড়ানো হয়েছে। গত ২১ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে শেষ হওয়া ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রথমে ২০ জুলাই প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা পিছিয়ে আগামী ১০ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফলাফল প্রকাশের এই বিলম্ব ও সময় পরিবর্তন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ৮ জুন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ডেকে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ২০ জুলাই ফলাফল প্রকাশ করা হবে। তবে ১৯ জুলাই বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, ২০ জুলাই ফল প্রকাশ হচ্ছে না। কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তা স্পষ্ট না করলেও তিনি দাবি করেছিলেন যে জুলাইয়ের মধ্যেই তারা ফলাফল প্রকাশের জন্য প্রস্তুত আছেন। এখন নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ আগস্ট। এই সিদ্ধান্তের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা নেতিবাচক মন্তব্য দেখা গেছে, যেখানে অনেকেই মন্ত্রীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
গত ২৬ জুলাই সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর চরাঞ্চলে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপকালে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তাদের গভীর দুশ্চিন্তার চিত্র উঠে আসে। অনেক শিক্ষার্থীই এবার ফেলের হার বাড়ার আশঙ্কা করছে। আজমেরি নামের এক পরীক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, বারবার তারিখ ঘোরানোর পেছনে কোনো মতলব থাকতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চরাঞ্চলের এক শিক্ষক মন্তব্য করেন, পাসের হার ঠিক রাখতে কতজনকে কত নম্বর গ্রেস দিয়ে পাস করানো হবে, তা নিয়ে হয়তো এক ধরনের 'অঙ্ক-কষাকষি' চলছে।
বিগত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ বছরের গড় পাসের হার ছিল ৮২.১৭ শতাংশ। এর মধ্যে ২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারির বিশেষ মূল্যায়নের কারণে সর্বোচ্চ পাসের হার ছিল ৯৩.৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬৮.৪৫ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ৮৩.০৪ শতাংশ পাসের হারের চেয়ে প্রায় ১৪.৬ শতাংশ কম। পাসের হার বাড়লে মিষ্টির বিক্রি বৃদ্ধি, কোচিং সেন্টারের বকেয়া আদায় এবং কলেজগুলোর ভর্তি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসে। তবে কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়ানো যেমন অনুচিত, তেমনি শিক্ষার মান বেড়েছে প্রমাণের জন্য অপ্রয়োজনীয় কড়াকড়ি করার মধ্যেও কোনো সাফল্য নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফলাফল প্রকাশের এই দীর্ঘ অপেক্ষা শিক্ষার্থীদের জীবনে মারাত্মক সামাজিক ও পারিবারিক প্রভাব ফেলছে। চরাঞ্চলের শিক্ষার্থী শামিমা আখতারকে তার পরিবার জানিয়ে দিয়েছে, ফেল করলে তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার কারণে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আসা বিয়ের প্রস্তাবগুলো ঠেকিয়ে এত দিন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছে সে। অন্যদিকে কাশেম আলী নামের আরেক শিক্ষার্থী জানায়, ফেল করলে তাকে নরসিংদীর একটি রি-রোলিং মিলে কাজে পাঠিয়ে দেওয়া হবে, কিন্তু সে কোনোভাবেই পড়াশোনা ছাড়তে চায় না এবং প্রয়োজনে মরতেও রাজি আছে।
ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদেরা। রংপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক জানান, গত বছর ১০ জুলাই এসএসসির ফল প্রকাশের পর প্রথম চার ঘণ্টাতেই ৯ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল এবং পরবর্তী তিন দিনে এই সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ১৬ জনে, যাদের অধিকাংশ ছিল মেয়ে। ২০১৮ সালে লন্ডনের কিংস কলেজের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক অবহেলা, কটূক্তি ও নিপীড়নের শিকার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকে। আমাদের দেশেও পরীক্ষার ফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীরা পরিবার ও সমাজের তীব্র মানসিক চাপের মুখে পড়ে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনেকেই কিছু আগাম ইঙ্গিত দেয়। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের এই লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
মৃত্যু বা আত্মহত্যা নিয়ে বারবার কথা বলা বা লেখা, যেমন ‘আমার মরে গেলেই ভালো’ বা ‘বেঁচে থাকার আর মানে কী’ ইত্যাদি।নিজের চেহারা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীনতা।পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।নিজের প্রিয় জিনিসপত্র অন্যকে দিয়ে দেওয়া।স্কুল, খেলাধুলা বা সামাজিক কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া।দীর্ঘ সময় মনমরা থাকার পর হঠাৎ অস্বাভাবিক উৎফুল্ল আচরণ করা।চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ সংগ্রহের চেষ্টা করা।গবেষক ও লেখক গওহার নঈম ওয়ারা মনে করেন, পরীক্ষায় পাস বা ফেলই জীবনের শেষ কথা নয়, জীবনের মূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি। এই কঠিন সময়ে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা, তাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলা এবং ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস বা অপমানজনক তুলনা থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার্থীদের মনে এই বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে যে একটি পরীক্ষা কোনোভাবেই জীবনের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না।





























