ঝুলে থাকা পে-স্কেল: সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার টানাপোড়েন

- আপডেট সময় : ০২:৩১:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্তমান অবস্থা অনেকটা পরিচিত প্রবাদ ‘মুলা ঝুলানো’র মতো। সামনে আশার আলো দেখানো হলেও সেই আশা পূরণের মুহূর্ত বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সালের পর জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষায় আছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই দাবি আরও জোরালো হয় এবং বিভিন্ন সময় গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনার খবর পাওয়া গিয়েছিল। বাজেটেও এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা চাকরিজীবীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস তৈরি করেছিল।
তবে দৈনিক সমকালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই প্রত্যাশায় এখন ভাটা পড়েছে। আগামী মাসে গেজেট প্রকাশের যে পরিকল্পনা ছিল, তা আপাতত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আরও পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়; সামনে আরও কয়েকটি বৈঠক হবে এবং তারপর সুপারিশ মন্ত্রিসভায় যাবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
এই বিলম্বের পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের পরামর্শকে বড় আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময় আইএমএফ অন্তত দুই বছর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। কারণ, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে, যা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে তাদের প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা মতো বাড়ছে না, উন্নয়ন ব্যয় বেশি এবং বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতাও কম নয়। অতীতের আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও ব্যাংক খাতের সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। সরকার একদিকে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আস্থাও ধরে রাখতে চায়। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পে-কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বিভিন্ন ভাতা যুক্ত করলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। যদিও সচিব কমিটি কিছু কাটছাঁটের সুপারিশ করেছে, তবুও ব্যয়ের পরিমাণ অনেক। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, তাই তাদের দাবি অযৌক্তিক নয়। তবে সরকারি বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, কারণ সরকারি বেতন বাড়ার খবর এলেই বাজারে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হলেও বাস্তবতা এখন আরও জটিল। অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগে সরকার হয়তো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না। তবে অস্পষ্টতা বা অনিশ্চয়তা সরকারি কর্মচারীদের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবেগের চেয়ে বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ রাখা জরুরি, কারণ অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বেশি হতাশা তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে সিদ্ধান্তটি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করে।





























