আফগানিস্তানে ব্যর্থতার আড়াই দশক পরও কি একই ভুল করছেন ট্রাম্প?

- আপডেট সময় : ০২:৪৯:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

চলতি মাসেই আফগানিস্তানের কাবুল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মার্কিন বাহিনীর বিশৃঙ্খল বিদায় বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর শুরু হওয়া এই ন্যাটো-সমর্থিত মার্কিন অভিযানকে এখন একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। এই দীর্ঘ যুদ্ধে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মার্কিন এবং ৪৫০ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। এছাড়া প্রাণ হারান হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ, যাদের সঠিক হিসাব আজও অজানা। আল-কায়েদাকে পরাস্ত করা গেলেও তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে দমন-পীড়নমূলক শাসন জারি করেছে। এটি হয়ে উঠেছে ‘চিরন্তন যুদ্ধের’ (ফরএভার ওয়ার) এক চরম দৃষ্টান্ত, যে পরিভাষাটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই চিরন্তন যুদ্ধের নির্মম শিক্ষা ইরাকের ক্ষেত্রেও পুনরায় দেখা গিয়েছিল। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সেখানে আগ্রাসন চালায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর ২০১১ সালে সামান্য লাভ নিয়ে ফিরে আসে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলা চালানোর মতো হঠকারী সিদ্ধান্তের পর আবারও একই রকম বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প যে যুদ্ধকে স্রেফ ‘ছোটখাটো অভিযান’ বলে অভিহিত করেছিলেন, তা ইতিমধ্যে ষষ্ঠ মাসে পদার্পণ করেছে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা আরেকটি চিরন্তন যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক এবং হেলমান্দ ও কাবুলে মার্কিন বাহিনীর সাবেক বেসামরিক উপদেষ্টা কার্টার মালকাসিয়ান মনে করেন, আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে সেনা মোতায়েন রাখার মূল যুক্তিটিই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ধারণা করা হয়েছিল যে মার্কিন সেনা না থাকলে দেশটি আবারও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হবে। তবে মালকাসিয়ান লিখেছেন, গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানভিত্তিক কোনো গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একটিও হামলা চালায়নি। অথচ এই যুদ্ধে ওয়াশিংটন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলার ব্যয় করেছে এবং ৭ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখন সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এই সামগ্রিক স্মৃতি ভুলে যাওয়া, যাতে তাত্ক্ষণিক ভয়ভীতি যেন সীমাহীন যুদ্ধের ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও আর্থিক ক্ষতির স্মৃতিকে ঢাকা না দেয়।
আফগানিস্তানের মতো ইরাক আগ্রাসনের ভিত্তিও ছিল সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। ২০০২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ দাবি করেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের কাছে রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্র রয়েছে। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি দাবি করেছিলেন, ইরাক আল-কায়দাকে সহায়তা দিচ্ছে। পরবর্তীতে এই দুটি দাবিই মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও পাকিস্তানে নাইন-ইলেভেন–পরবর্তী সহিংসতায় প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ সরাসরি নিহত হয়েছেন এবং পরোক্ষ প্রভাবে মারা গেছেন প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভিয়েতনাম যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানোর ‘ডমিনো তত্ত্ব’ সামনে এনেছিল, যা মূলত ছিল মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। বর্তমানে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জেনেশুনেই ইরান-সংক্রান্ত হুমকিকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করছেন। ২০০৩ সালের ইরাকের মতোই ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই এবং তারা তা অর্জনের চেষ্টা করছে বলেও কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। তা সত্ত্বেও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটি আবারও কাল্পনিক ভয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মেতে উঠেছে।
ভেনেজুয়েলা, কিউবা, কলম্বিয়া, পানামা বা গ্রিনল্যান্ডের মতো প্রতিবেশীদের প্রতি ট্রাম্পের বৈরী মনোভাবের পেছনে রয়েছে পুরো বিশ্বের ওপর মার্কিন কর্তৃত্ব বজায় রাখার এক চিরন্তন মানসিকতা। ট্রাম্প এখন গণতন্ত্রের প্রসারের চেয়ে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছেন। ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ থেকে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাঁর বিশেষ নজরদারি প্রমাণ করে যে, কীভাবে মার্কিন নিরাপত্তানীতি মূলত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। দ্য গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিবিষয়ক ধারাভাষ্যকার সাইমন টিসডালের বিশ্লেষণধর্মী লেখায় এই চিত্র উঠে এসেছে।




























