ঢাকা ০৪:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
হামজার বিতর্কিত লাল কার্ডে ক্ষোভে ফুঁসছেন শেফিল্ড কোচ সৌদিগামী ১০৩ ফ্লাইট ব্যাহত, ভোগান্তিতে ১৫ হাজার ৭৭৯ যাত্রী খালি পেটে শিঙাড়া খেলে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে পেশোয়ারে স্কুল ভবন ধসে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ নিহত ২১ প্রাথমিক গণিত শিক্ষায় এআই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে ডাচ গবেষকদের গবেষণা পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে সুশাসন ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দিলেন প্রতিমন্ত্রী কলাপাড়ায় বাবার পাশে ঘুমানো ১০ মাস বয়সি শিশু নিখোঁজ উত্তরায় পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার, স্বাভাবিক যান চলাচল দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের ভয়াবহ অভিযোগ সারের ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্ত দাবি জামায়াতের

প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে সিইও বনাম চিফ এক্সকিউজ অফিসার দ্বন্দ্বের অবসান জরুরি

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৬:০২:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রতিটি সফল প্রতিষ্ঠানে একজন চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার বা সিইও থাকেন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেন এবং মানুষকে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রেরণা জোগান। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে প্রায়ই আরেকজন ‘সিইও’ থেকে যান—যাঁর কোনো নির্বাহী পদবি নেই, অথচ প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের ওপর যাঁর প্রভাব সুগভীর। ইনি ‘চিফ এক্সকিউজ অফিসার’ বা ‘প্রধান অজুহাত কর্মকর্তা’। চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার প্রশ্ন করেন, ‘আমরা কীভাবে এটা করতে পারি?’ আর চিফ এক্সকিউজ অফিসার প্রশ্ন করেন, ‘এটা কেন সম্ভব নয়?’ একজন গতি তৈরি করেন, অন্যজন নিঃশব্দে সেই গতি নিঃশেষ করে দেন। একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ধারিত হয় এই দুই ‘সিইও’র মধ্যে কার প্রভাব সাংস্কৃতিকভাবে বেশি শক্তিশালী, তার ওপর।

প্রকৃত নির্বাহী প্রধানের কাজ কার্যক্রম তদারকি বা প্রতিবেদন পর্যালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেন, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন করেন, দক্ষ দল গড়ে তোলেন এবং এমন পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে উদ্ভাবন বিকশিত হতে পারে। তবে সবচেয়ে দক্ষ প্রধান নির্বাহীও একা প্রতিষ্ঠান বদলাতে পারেন না। বাস্তবায়ন ছাড়া দৃষ্টিভঙ্গি নিছক আকাঙ্ক্ষা মাত্র। প্রতিটি কৌশলের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে কর্মীদের প্রতিদিনের অসংখ্য সিদ্ধান্তের ওপর—একজন গ্রাহকসেবা প্রতিনিধি জটিল অভিযোগের সমাধান করছেন, একজন প্রযুক্তিবিদ ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে আসছেন—এসবই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দেয়।

আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হয় এখান থেকেই। চিফ এক্সকিউজ অফিসার আসলে কোনো পদবি নয়—এটি একধরনের মানসিকতা, যা থাকতে পারে বোর্ডরুমে, মধ্যম ব্যবস্থাপনায়, কিংবা প্রান্তিক পর্যায়ে। যখনই কেউ ধারাবাহিকভাবে মালিকানার বদলে সাফাই, সাহসের বদলে স্বাচ্ছন্দ্য বেছে নেন, তখনই বুঝতে হবে চিফ এক্সকিউজ অফিসার কক্ষে প্রবেশ করেছেন। এই মানসিকতা সহজে প্রকাশ পায় না; আসে যুক্তি বা অভিজ্ঞতার ছদ্মবেশে—‘আমরা আগেও এটা চেষ্টা করেছি’, ‘আমাদের গ্রাহকেরা এটা মেনে নেবেন না’, ‘আমাদের হাতে যথেষ্ট সম্পদ নেই’, ‘এটা অন্য জায়গায় কাজ করতে পারে, এখানে নয়’, ‘আমরা সব সময় এভাবেই কাজ করে এসেছি।’ প্রথম শুনলে এসব যুক্তিসংগত মনে হতে পারে, আর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই সুবিবেচিত ঝুঁকি মূল্যায়ন দরকার। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রতিটি নতুন উদ্যোগ চিন্তাশীল মূল্যায়নের বদলে অভ্যাসগত প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়।

পরিহাসের বিষয়, অনেক চিফ এক্সকিউজ অফিসারই অত্যন্ত অভিজ্ঞ পেশাদার, যাঁদের কাছে মূল্যবান প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আছে। কিন্তু সেই ইতিহাসই ফাঁদে পরিণত হয়, যখন তা মানুষকে ভবিষ্যৎ গ্রহণ করতে বাধা দেয়। তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন না, ‘আমাদের কী হতে হবে’; বরং বারবার প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের কেন বদলাতে হবে’। অজুহাতনির্ভর সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার উদ্ভাবন। ডিজিটাল ব্যাংকিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দূরবর্তী কর্মপদ্ধতি, ক্লাউড কম্পিউটিং—সবকিছুই মূলধারায় আসার আগে সংশয়ের মুখোমুখি হয়েছিল। প্রতিষ্ঠান খুব কমই কেবল বহিরাগত প্রতিযোগিতার কারণে পরাজিত হয়। বরং প্রায়ই তারা ভেতর থেকে ধীর হয়ে পড়ে এমন এক সংস্কৃতির কারণে, যেখানে বাস্তবায়নের চেয়ে অজুহাত সহজ হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠান অসাধারণ হয়ে ওঠে না শুধু ব্যতিক্রমী নেতৃত্বের কারণে—তারা অসাধারণ হয় তখনই, যখন সাধারণ মানুষেরা সিদ্ধান্ত নেন, অজুহাত আর তাঁদের সংস্কৃতির অংশ নয়।

প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কেবল তাঁদেরই কথা শুনত, যাঁরা ব্যাখ্যা করেন কেন পরিবর্তন অসম্ভব, তাহলে আজকের অনেক বড় উদ্ভাবনই বাস্তবে রূপ নিত না। এই সংস্কৃতি শুধু উদ্ভাবন বিলম্বিত করে না, উদ্ভাবকদেরও নিরুৎসাহিত করে—বারবার অহেতুক প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়ে অনেক কর্মী ধারণা প্রস্তাব করাই বন্ধ করে দেন, কেউ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, কেউ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান। এই মানসিকতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি প্রায়ই আনুগত্যের ছদ্মবেশ নেয়। অনেকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য রক্ষা করছেন, অথচ বাস্তবে হয়তো রক্ষা করছেন নিজেদের পরিচিত পরিবেশ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে। পরিবর্তন মানেই শেখা, খাপ খাওয়ানো ও দায়বদ্ধতা—আর যাঁরা বদলাতে অনিচ্ছুক, তাঁদের কাছে প্রতিরোধ হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার একধরনের উপায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে এই চ্যালেঞ্জ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি, নেতৃত্ব উন্নয়ন ও ডিজিটাল সক্ষমতায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। কিন্তু কোনো বিনিয়োগই এমন কাউকে বদলাতে পারে না, যিনি ইতিমধ্যে বদলাতে না চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ প্রতিস্থাপন করবে না, পুরস্কৃত করবে অভিযোজনক্ষমতাকে। যাঁরা ভবিষ্যতে মূল্যবান থাকবেন, তাঁরা দীর্ঘতম অভিজ্ঞতার অধিকারী নন; বরং তাঁরাই, যাঁরা ক্রমাগত শেখেন ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কৌতূহলী থাকেন। তাই নেতাদের উচিত সুস্থ মতভেদকে উৎসাহিত করা, কিন্তু সেই সঙ্গে গঠনমূলক প্রশ্ন ও অভ্যাসগত বাধাদানের মধ্যে পার্থক্য করা। কর্মদক্ষতা মূল্যায়নও শুধু আউটপুট দিয়ে নয়, অভিযোজনক্ষমতা, শেখার দক্ষতা ও মালিকানাবোধকেও স্বীকৃতি দিয়ে হওয়া উচিত।

এই দুই মানসিকতার মধ্যে পাঁচটি মূল পার্থক্য রয়েছে। চ্যালেঞ্জকে দূরদর্শী মানসিকতা দেখে সুযোগ হিসেবে, অজুহাতনির্ভর মানসিকতা দেখে বাধা হিসেবে। একজন পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করেন, অন্যজন পরিচিত রুটিন আঁকড়ে থাকেন। একজন ফলাফলের দায়িত্ব নেন, অন্যজন দায় চাপান পরিস্থিতি বা সম্পদের ওপর। একজন সিদ্ধান্ত নেন দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের ভিত্তিতে, অন্যজন ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তিতে। একজন গড়ে তোলেন আস্থা ও উদ্ভাবনের সংস্কৃতি, অন্যজন তৈরি করেন দ্বিধা ও আত্মতুষ্টির সংস্কৃতি। এক বাক্যে বলতে গেলে—চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার বলেন, ‘চলো একটা পথ খুঁজি।’ আর চিফ এক্সকিউজ অফিসার বলেন, ‘চলো একটা কারণ খুঁজি, কেন এটা হবে না।’ শেষ পর্যন্ত, প্রতিটি কর্মীকে প্রতিদিন একটি পছন্দের মুখোমুখি হতে হয়: ‘আমরা কীভাবে এটা সম্ভব করব’—নাকি ‘এটা কেন সম্ভব নয়’। এই পছন্দই গড়ে দেয় ক্যারিয়ার, দল ও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ। ‘সিইও’ পদবি কখনোই শুধু কর্ণার অফিসে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; প্রতিটি কর্মীরই লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘চিফ এক্সকিউশন অফিসার’ হয়ে ওঠা।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে সিইও বনাম চিফ এক্সকিউজ অফিসার দ্বন্দ্বের অবসান জরুরি

আপডেট সময় : ০৬:০২:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

প্রতিটি সফল প্রতিষ্ঠানে একজন চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার বা সিইও থাকেন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেন এবং মানুষকে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রেরণা জোগান। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে প্রায়ই আরেকজন ‘সিইও’ থেকে যান—যাঁর কোনো নির্বাহী পদবি নেই, অথচ প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের ওপর যাঁর প্রভাব সুগভীর। ইনি ‘চিফ এক্সকিউজ অফিসার’ বা ‘প্রধান অজুহাত কর্মকর্তা’। চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার প্রশ্ন করেন, ‘আমরা কীভাবে এটা করতে পারি?’ আর চিফ এক্সকিউজ অফিসার প্রশ্ন করেন, ‘এটা কেন সম্ভব নয়?’ একজন গতি তৈরি করেন, অন্যজন নিঃশব্দে সেই গতি নিঃশেষ করে দেন। একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ধারিত হয় এই দুই ‘সিইও’র মধ্যে কার প্রভাব সাংস্কৃতিকভাবে বেশি শক্তিশালী, তার ওপর।

প্রকৃত নির্বাহী প্রধানের কাজ কার্যক্রম তদারকি বা প্রতিবেদন পর্যালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেন, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন করেন, দক্ষ দল গড়ে তোলেন এবং এমন পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে উদ্ভাবন বিকশিত হতে পারে। তবে সবচেয়ে দক্ষ প্রধান নির্বাহীও একা প্রতিষ্ঠান বদলাতে পারেন না। বাস্তবায়ন ছাড়া দৃষ্টিভঙ্গি নিছক আকাঙ্ক্ষা মাত্র। প্রতিটি কৌশলের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে কর্মীদের প্রতিদিনের অসংখ্য সিদ্ধান্তের ওপর—একজন গ্রাহকসেবা প্রতিনিধি জটিল অভিযোগের সমাধান করছেন, একজন প্রযুক্তিবিদ ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে আসছেন—এসবই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দেয়।

আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হয় এখান থেকেই। চিফ এক্সকিউজ অফিসার আসলে কোনো পদবি নয়—এটি একধরনের মানসিকতা, যা থাকতে পারে বোর্ডরুমে, মধ্যম ব্যবস্থাপনায়, কিংবা প্রান্তিক পর্যায়ে। যখনই কেউ ধারাবাহিকভাবে মালিকানার বদলে সাফাই, সাহসের বদলে স্বাচ্ছন্দ্য বেছে নেন, তখনই বুঝতে হবে চিফ এক্সকিউজ অফিসার কক্ষে প্রবেশ করেছেন। এই মানসিকতা সহজে প্রকাশ পায় না; আসে যুক্তি বা অভিজ্ঞতার ছদ্মবেশে—‘আমরা আগেও এটা চেষ্টা করেছি’, ‘আমাদের গ্রাহকেরা এটা মেনে নেবেন না’, ‘আমাদের হাতে যথেষ্ট সম্পদ নেই’, ‘এটা অন্য জায়গায় কাজ করতে পারে, এখানে নয়’, ‘আমরা সব সময় এভাবেই কাজ করে এসেছি।’ প্রথম শুনলে এসব যুক্তিসংগত মনে হতে পারে, আর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই সুবিবেচিত ঝুঁকি মূল্যায়ন দরকার। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রতিটি নতুন উদ্যোগ চিন্তাশীল মূল্যায়নের বদলে অভ্যাসগত প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়।

পরিহাসের বিষয়, অনেক চিফ এক্সকিউজ অফিসারই অত্যন্ত অভিজ্ঞ পেশাদার, যাঁদের কাছে মূল্যবান প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আছে। কিন্তু সেই ইতিহাসই ফাঁদে পরিণত হয়, যখন তা মানুষকে ভবিষ্যৎ গ্রহণ করতে বাধা দেয়। তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন না, ‘আমাদের কী হতে হবে’; বরং বারবার প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের কেন বদলাতে হবে’। অজুহাতনির্ভর সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার উদ্ভাবন। ডিজিটাল ব্যাংকিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দূরবর্তী কর্মপদ্ধতি, ক্লাউড কম্পিউটিং—সবকিছুই মূলধারায় আসার আগে সংশয়ের মুখোমুখি হয়েছিল। প্রতিষ্ঠান খুব কমই কেবল বহিরাগত প্রতিযোগিতার কারণে পরাজিত হয়। বরং প্রায়ই তারা ভেতর থেকে ধীর হয়ে পড়ে এমন এক সংস্কৃতির কারণে, যেখানে বাস্তবায়নের চেয়ে অজুহাত সহজ হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠান অসাধারণ হয়ে ওঠে না শুধু ব্যতিক্রমী নেতৃত্বের কারণে—তারা অসাধারণ হয় তখনই, যখন সাধারণ মানুষেরা সিদ্ধান্ত নেন, অজুহাত আর তাঁদের সংস্কৃতির অংশ নয়।

প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কেবল তাঁদেরই কথা শুনত, যাঁরা ব্যাখ্যা করেন কেন পরিবর্তন অসম্ভব, তাহলে আজকের অনেক বড় উদ্ভাবনই বাস্তবে রূপ নিত না। এই সংস্কৃতি শুধু উদ্ভাবন বিলম্বিত করে না, উদ্ভাবকদেরও নিরুৎসাহিত করে—বারবার অহেতুক প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়ে অনেক কর্মী ধারণা প্রস্তাব করাই বন্ধ করে দেন, কেউ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, কেউ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান। এই মানসিকতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি প্রায়ই আনুগত্যের ছদ্মবেশ নেয়। অনেকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য রক্ষা করছেন, অথচ বাস্তবে হয়তো রক্ষা করছেন নিজেদের পরিচিত পরিবেশ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে। পরিবর্তন মানেই শেখা, খাপ খাওয়ানো ও দায়বদ্ধতা—আর যাঁরা বদলাতে অনিচ্ছুক, তাঁদের কাছে প্রতিরোধ হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার একধরনের উপায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে এই চ্যালেঞ্জ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি, নেতৃত্ব উন্নয়ন ও ডিজিটাল সক্ষমতায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। কিন্তু কোনো বিনিয়োগই এমন কাউকে বদলাতে পারে না, যিনি ইতিমধ্যে বদলাতে না চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ প্রতিস্থাপন করবে না, পুরস্কৃত করবে অভিযোজনক্ষমতাকে। যাঁরা ভবিষ্যতে মূল্যবান থাকবেন, তাঁরা দীর্ঘতম অভিজ্ঞতার অধিকারী নন; বরং তাঁরাই, যাঁরা ক্রমাগত শেখেন ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কৌতূহলী থাকেন। তাই নেতাদের উচিত সুস্থ মতভেদকে উৎসাহিত করা, কিন্তু সেই সঙ্গে গঠনমূলক প্রশ্ন ও অভ্যাসগত বাধাদানের মধ্যে পার্থক্য করা। কর্মদক্ষতা মূল্যায়নও শুধু আউটপুট দিয়ে নয়, অভিযোজনক্ষমতা, শেখার দক্ষতা ও মালিকানাবোধকেও স্বীকৃতি দিয়ে হওয়া উচিত।

এই দুই মানসিকতার মধ্যে পাঁচটি মূল পার্থক্য রয়েছে। চ্যালেঞ্জকে দূরদর্শী মানসিকতা দেখে সুযোগ হিসেবে, অজুহাতনির্ভর মানসিকতা দেখে বাধা হিসেবে। একজন পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করেন, অন্যজন পরিচিত রুটিন আঁকড়ে থাকেন। একজন ফলাফলের দায়িত্ব নেন, অন্যজন দায় চাপান পরিস্থিতি বা সম্পদের ওপর। একজন সিদ্ধান্ত নেন দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের ভিত্তিতে, অন্যজন ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তিতে। একজন গড়ে তোলেন আস্থা ও উদ্ভাবনের সংস্কৃতি, অন্যজন তৈরি করেন দ্বিধা ও আত্মতুষ্টির সংস্কৃতি। এক বাক্যে বলতে গেলে—চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার বলেন, ‘চলো একটা পথ খুঁজি।’ আর চিফ এক্সকিউজ অফিসার বলেন, ‘চলো একটা কারণ খুঁজি, কেন এটা হবে না।’ শেষ পর্যন্ত, প্রতিটি কর্মীকে প্রতিদিন একটি পছন্দের মুখোমুখি হতে হয়: ‘আমরা কীভাবে এটা সম্ভব করব’—নাকি ‘এটা কেন সম্ভব নয়’। এই পছন্দই গড়ে দেয় ক্যারিয়ার, দল ও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ। ‘সিইও’ পদবি কখনোই শুধু কর্ণার অফিসে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; প্রতিটি কর্মীরই লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘চিফ এক্সকিউশন অফিসার’ হয়ে ওঠা।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo