ঢাকা ০১:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষার আহ্বান প্রেসিডেন্টের ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় আসছে পরিবর্তন ইউনূসকে হেনস্তা কেবল শুরু, মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ নেতার টঙ্গীতে ওষুধ কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ১৪ ইউনিট দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে বিশেষ অবদান, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেলেন মিরসরাইয়ের উম্মে হাবিবা টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে ১২ ইউনিট খুলনা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস মহাশূন্যে পৃথিবীর চেয়েও বাসযোগ্য গ্রহ থাকতে পারে, বিজ্ঞানীদের গবেষণা ইরানের বিরুদ্ধে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, নতুন হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের বিহারের গঙ্গায় নৌকাডুবি: শিশুসহ নিহত ১৩

ডেঙ্গুতে ৩০০ মৃত্যু: প্রশাসনিক ব্যর্থতা নাকি সুশাসনের ঘাটতি, প্রশ্ন আইনজীবীর

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৬:০০:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ৩৭ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি সুপরিচিত উক্তি রয়েছে—একই কাজ বারবার করে ভিন্ন ফলাফলের প্রত্যাশা করাই হলো উন্মাদনা। বাংলাদেশে বছর পর বছর ডেঙ্গু মোকাবিলার সরকারি চিত্রটি পর্যবেক্ষণ করলে সেই চর্চারই প্রতিফল দেখা যায়। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যে ৩০০ অতিক্রম করেছে। দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের স্থান না পেয়ে মেঝে ও সিঁড়িতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখার ঘোষণা পর্যন্ত দিয়েছে। এ অবস্থাকে নিছক পরিসংখ্যান না বলে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দলিল হিসেবে দেখছেন নগর অধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ওমর সাদাত।

বিগত সব সরকারের আমলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তন, মন্ত্রী ও সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে রদবদল হলেও বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আইনজীবী ওমর সাদাত মনে করেন, এ ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা বলে ক্ষমা করার দিন পার হয়ে গেছে। এখন বিষয়টিকে সাংবিধানিক ও আইনি দায়বদ্ধতার আলোকেই বিচার করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ আদালতের একাধিক রায় অনুযায়ী শুধু বেঁচে থাকা নয়, বরং সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশে বাস করার অধিকারকেও বোঝায়। পাশাপাশি ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই দুটি অনুচ্ছেদের আলোকে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে প্রতিবছর শত শত নাগরিকের প্রাণহানি ঘটা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া কিংবা পৃথিবীর বহু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে এডিস মশার অস্তিত্ব রয়েছে। তবে তারা বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, সার্বক্ষণিক নজরদারি, উৎসে মশা নিধন এবং কঠোর জবাবদিহির মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্য পেয়েছে। একজন কীটতত্ত্ববিদের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে বলা হয়, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে থাকলে গত বছর ৬২ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হতেন না এবং এ বছরও মশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকত না। অর্থাৎ ডেঙ্গু রোগটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি বারবার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে।

মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা যে আইনি বিচারে গ্রহণযোগ্য, তার নজির উচ্চ আদালত আগেই স্থাপন করেছেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উপদ্রব রুখতে না পারায় হাইকোর্ট ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে ভর্ৎসনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার এবং নির্দিষ্ট সময়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এই ধরনের বিচারিক হস্তক্ষেপ এখনো বিচ্ছিন্ন ও নির্দিষ্ট স্থানকেন্দ্রিক রয়ে গেছে, অথচ এটি একটি জাতীয় সংকট।

সরকারি জরিপেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সিমেন্টের পানির ট্যাংক ও জলমগ্ন মেঝেকে মশার প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সমস্যার স্পষ্ট মানচিত্র হাতে থাকা সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া দায়িত্ব পালনে চরম ঔদাসীন্য ও অবহেলার নামান্তর, যা আইনের চোখে জবাবদিহির আওতায় আসা উচিত।

প্রতিবছর মশক নিধনে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়, বিপুল পরিমাণে কীটনাশক কেনা হয় এবং ধোঁয়া দিয়ে ফগিং করা হয়। কিন্তু এসব পদক্ষেপে কত শতাংশ মশা কমল, ওয়ার্ডভিত্তিক মানচিত্র কোথায়, কীটনাশকের কার্যকারিতা ও প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষার ফল কী এবং স্বাধীন নিরীক্ষা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে দরপত্র ছাড়াই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে কোটি টাকার ওষুধ কেনার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। সরকার বদলের পরও সে চিত্রের পরিবর্তন হয়নি; সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটিতে একজন উপদেষ্টার মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে মশার ওষুধ কেনা হয়েছে। আবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় একটি কীটনাশক নিষিদ্ধ করলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একই ওষুধ ব্যবহার করে গেছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কীটনাশক ভান্ডারে অভিযান চালিয়ে জালিয়াতির অভিযোগও পেয়েছে।

জনস্বাস্থ্যের নামে বরাদ্দকৃত অর্থে এ ধরনের অনিয়ম কোনো একক দলের বিষয় নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। রাস্তার কাজে দুর্নীতি হলে রাস্তা নষ্ট হয়, কিন্তু মশা মারার কাজে অনিয়ম হলে মানুষের জীবন যায়। ফৌজদারি আইনের আওতায়, নিম্নমানের বা অপরীক্ষিত কীটনাশক জেনেবুঝে কেনা ও ব্যবহার করা, বিশেষ করে যখন তার ফলে প্রাণহানি ঘটে, তা কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা নয়, বরং অবহেলাজনিত অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী এসব ঘটনার দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

পূর্ব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মেয়র, সচিব ও বিশেষজ্ঞদের একাধিক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডকে উপ-অঞ্চলে ভাগ করে সমন্বিত মশক নিধন অভিযান চালানো হবে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশাসনিক আইন অনুযায়ী যেখানে ক্ষমতা অর্পিত, দায়ও সেখানে বর্তায়। সিটি করপোরেশন নিজ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উচিত প্রশাসনিক কৈফিয়ত তলব করা এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

প্রতিবেশী শহর কলকাতার উদাহরণ টেনে বলা হয়, তারা কেবল ফগার মেশিন দিয়ে সাময়িক ধোঁয়া না উড়িয়ে বৃষ্টির মৌসুম শুরুর আগেই নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত টানা আট মাস উৎসে মশা নিধনে কাজ করে সফলতা পেয়েছে। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাংলাদেশেও সিটি করপোরেশন আইনে বার্ষিক মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনা জমা ও বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে আইনি কাঠামোয় আনা সম্ভব।

বিদ্যমান সংকট নিরসনে আইনজীবী ওমর সাদাত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। প্রথমত, ডেঙ্গুকে মৌসুমি সমস্যা না ভেবে স্থায়ী জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া, যাতে সারা বছরের বাজেট, জনবল ও জবাবদিহি নির্ধারিত থাকে। দ্বিতীয়ত, সংক্রামক রোগ আইন ও স্থানীয় সরকার আইনে পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক যুক্ত করা, যেন ব্যর্থতা প্রমাণসাপেক্ষে শাস্তিযোগ্য হয়। তৃতীয়ত, কীটনাশক ক্রয়ে স্বাধীন পরীক্ষা ও প্রকাশ্য নিরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রাখা। চতুর্থত, প্রমাণিত প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতিতে মৃত্যু হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা। পঞ্চমত, আইনজীবী সমিতি ও সুশীল সমাজের উদ্যোগে সর্বোচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা দায়ের করে একটি জাতীয় বিচারিক নির্দেশনা আদায় করা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার ধারাবাহিকতা—প্রশ্নটা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহির সক্ষমতার। এবার নিজেদের শাসনব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে, নয়তো আগামী বছরও একই সংখ্যার প্রাণহানি ও একই আর্তনাদ দেখতে হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

ডেঙ্গুতে ৩০০ মৃত্যু: প্রশাসনিক ব্যর্থতা নাকি সুশাসনের ঘাটতি, প্রশ্ন আইনজীবীর

আপডেট সময় : ০৬:০০:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি সুপরিচিত উক্তি রয়েছে—একই কাজ বারবার করে ভিন্ন ফলাফলের প্রত্যাশা করাই হলো উন্মাদনা। বাংলাদেশে বছর পর বছর ডেঙ্গু মোকাবিলার সরকারি চিত্রটি পর্যবেক্ষণ করলে সেই চর্চারই প্রতিফল দেখা যায়। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যে ৩০০ অতিক্রম করেছে। দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের স্থান না পেয়ে মেঝে ও সিঁড়িতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখার ঘোষণা পর্যন্ত দিয়েছে। এ অবস্থাকে নিছক পরিসংখ্যান না বলে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দলিল হিসেবে দেখছেন নগর অধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ওমর সাদাত।

বিগত সব সরকারের আমলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তন, মন্ত্রী ও সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে রদবদল হলেও বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আইনজীবী ওমর সাদাত মনে করেন, এ ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা বলে ক্ষমা করার দিন পার হয়ে গেছে। এখন বিষয়টিকে সাংবিধানিক ও আইনি দায়বদ্ধতার আলোকেই বিচার করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ আদালতের একাধিক রায় অনুযায়ী শুধু বেঁচে থাকা নয়, বরং সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশে বাস করার অধিকারকেও বোঝায়। পাশাপাশি ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই দুটি অনুচ্ছেদের আলোকে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে প্রতিবছর শত শত নাগরিকের প্রাণহানি ঘটা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া কিংবা পৃথিবীর বহু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে এডিস মশার অস্তিত্ব রয়েছে। তবে তারা বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, সার্বক্ষণিক নজরদারি, উৎসে মশা নিধন এবং কঠোর জবাবদিহির মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্য পেয়েছে। একজন কীটতত্ত্ববিদের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে বলা হয়, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে থাকলে গত বছর ৬২ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হতেন না এবং এ বছরও মশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকত না। অর্থাৎ ডেঙ্গু রোগটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি বারবার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে।

মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা যে আইনি বিচারে গ্রহণযোগ্য, তার নজির উচ্চ আদালত আগেই স্থাপন করেছেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উপদ্রব রুখতে না পারায় হাইকোর্ট ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে ভর্ৎসনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার এবং নির্দিষ্ট সময়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এই ধরনের বিচারিক হস্তক্ষেপ এখনো বিচ্ছিন্ন ও নির্দিষ্ট স্থানকেন্দ্রিক রয়ে গেছে, অথচ এটি একটি জাতীয় সংকট।

সরকারি জরিপেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সিমেন্টের পানির ট্যাংক ও জলমগ্ন মেঝেকে মশার প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সমস্যার স্পষ্ট মানচিত্র হাতে থাকা সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া দায়িত্ব পালনে চরম ঔদাসীন্য ও অবহেলার নামান্তর, যা আইনের চোখে জবাবদিহির আওতায় আসা উচিত।

প্রতিবছর মশক নিধনে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়, বিপুল পরিমাণে কীটনাশক কেনা হয় এবং ধোঁয়া দিয়ে ফগিং করা হয়। কিন্তু এসব পদক্ষেপে কত শতাংশ মশা কমল, ওয়ার্ডভিত্তিক মানচিত্র কোথায়, কীটনাশকের কার্যকারিতা ও প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষার ফল কী এবং স্বাধীন নিরীক্ষা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে দরপত্র ছাড়াই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে কোটি টাকার ওষুধ কেনার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। সরকার বদলের পরও সে চিত্রের পরিবর্তন হয়নি; সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটিতে একজন উপদেষ্টার মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে মশার ওষুধ কেনা হয়েছে। আবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় একটি কীটনাশক নিষিদ্ধ করলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একই ওষুধ ব্যবহার করে গেছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কীটনাশক ভান্ডারে অভিযান চালিয়ে জালিয়াতির অভিযোগও পেয়েছে।

জনস্বাস্থ্যের নামে বরাদ্দকৃত অর্থে এ ধরনের অনিয়ম কোনো একক দলের বিষয় নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। রাস্তার কাজে দুর্নীতি হলে রাস্তা নষ্ট হয়, কিন্তু মশা মারার কাজে অনিয়ম হলে মানুষের জীবন যায়। ফৌজদারি আইনের আওতায়, নিম্নমানের বা অপরীক্ষিত কীটনাশক জেনেবুঝে কেনা ও ব্যবহার করা, বিশেষ করে যখন তার ফলে প্রাণহানি ঘটে, তা কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা নয়, বরং অবহেলাজনিত অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী এসব ঘটনার দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

পূর্ব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মেয়র, সচিব ও বিশেষজ্ঞদের একাধিক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডকে উপ-অঞ্চলে ভাগ করে সমন্বিত মশক নিধন অভিযান চালানো হবে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশাসনিক আইন অনুযায়ী যেখানে ক্ষমতা অর্পিত, দায়ও সেখানে বর্তায়। সিটি করপোরেশন নিজ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উচিত প্রশাসনিক কৈফিয়ত তলব করা এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

প্রতিবেশী শহর কলকাতার উদাহরণ টেনে বলা হয়, তারা কেবল ফগার মেশিন দিয়ে সাময়িক ধোঁয়া না উড়িয়ে বৃষ্টির মৌসুম শুরুর আগেই নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত টানা আট মাস উৎসে মশা নিধনে কাজ করে সফলতা পেয়েছে। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাংলাদেশেও সিটি করপোরেশন আইনে বার্ষিক মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনা জমা ও বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে আইনি কাঠামোয় আনা সম্ভব।

বিদ্যমান সংকট নিরসনে আইনজীবী ওমর সাদাত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। প্রথমত, ডেঙ্গুকে মৌসুমি সমস্যা না ভেবে স্থায়ী জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া, যাতে সারা বছরের বাজেট, জনবল ও জবাবদিহি নির্ধারিত থাকে। দ্বিতীয়ত, সংক্রামক রোগ আইন ও স্থানীয় সরকার আইনে পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক যুক্ত করা, যেন ব্যর্থতা প্রমাণসাপেক্ষে শাস্তিযোগ্য হয়। তৃতীয়ত, কীটনাশক ক্রয়ে স্বাধীন পরীক্ষা ও প্রকাশ্য নিরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রাখা। চতুর্থত, প্রমাণিত প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতিতে মৃত্যু হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা। পঞ্চমত, আইনজীবী সমিতি ও সুশীল সমাজের উদ্যোগে সর্বোচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা দায়ের করে একটি জাতীয় বিচারিক নির্দেশনা আদায় করা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার ধারাবাহিকতা—প্রশ্নটা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহির সক্ষমতার। এবার নিজেদের শাসনব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে, নয়তো আগামী বছরও একই সংখ্যার প্রাণহানি ও একই আর্তনাদ দেখতে হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo