মোদি শাসনের কি শেষ শুরু? রাজপথে উত্তাল ভারত
- আপডেট সময় : ০৩:১২:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

প্রবাদ আছে, যদি একটি মুরগির গায়ের পালক এক এক করে উপড়ে ফেলা হয়, তবে চট করে কেউ তা টের পায় না। অনেকেই এই বিভ্রান্তিতে ভোগেন যে ছোট ছোট অন্যায় বা অনিয়ম হয়তো কখনোই তাঁদের পেছনে তাড়া করে ফিরবে না। কিন্তু এই কৌশলের প্রধান সমস্যা হলো, এক সুন্দর সকালে সব সত্য কোনো রকম ঢাকঢাক গুড়গুড় ছাড়াই একদম উলঙ্গ রূপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। এই অক্টোবরে ভারতের গণতন্ত্রকে ঠিক সেই পালক-ছেঁড়া মুরগির মতোই মনে হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা কৌতুক করে নিজেদের ‘ককরোচ’ বলে ডাকছেন এবং তাঁরা ভারতের রাজপথজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে এসেছেন।
নরেন্দ্র মোদি নিজেকে আজ যেভাবে কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন, সেনা-পুলিশের ব্যারিকেডের আড়ালে আত্মরক্ষা করছেন এবং যে তরুণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখোমুখি হচ্ছেন—যাঁদের কাছে গণতন্ত্রের এই তিলে তিলে ধ্বংসের পর হারানোর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই—তার পেছনে ১২ বছর ধরে লাগাতার পালক উপড়ানোর ইতিহাস রয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ১০ অক্টোবর আয়োজিত বিশাল এক বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়ে মোদি নিজের ভুলগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন। তাঁর সরকার দেশজুড়ে যেসব কঠোর পদক্ষেপ জারি করেছে, তা যেন আশির দশকের সেই জরুরি অবস্থার দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়।
সমাবেশ শুরু হওয়ার আগেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজিপি) আন্দোলনের শীর্ষ মুখ রত্না সিং, অভিজিৎ দিপকে এবং ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয়। আটক করা হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীসহ আরও বহু অধিকারকর্মীকে। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী দিল্লির রাজপথে নেমে আসেন এবং নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালান। পুরো ভারতজুড়ে একের পর এক শহরে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা গেছে। দিনভর পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলেছে, কিন্তু আন্দোলনকারীরা রাজপথ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। সন্ধ্যার মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৫০০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের অনেককে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সরকারের এসব বলপ্রয়োগ মোদির নড়বড়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। সমালোচকরা এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন, প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মোদি আদৌ আর যোগ্য কি না। গত শুক্রবার রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি জমা দিয়ে বলেছে, বর্তমান সরকার ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের নামে পরিচালিত ‘বিশেষ নিবিড় পুনর্বিন্যাস’ (এসআইআর) প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত তাঁর উপড়ানো শেষ পালক, যার মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি ভারতীয় নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে, বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের একটি পুরোনো দুর্নীতি মামলা নতুন করে সামনে আসার পরও তাঁর পদত্যাগ না করায়।
মোদির মন্ত্রীরা এত দিন ঘৃণা ছড়ানো আর সমাজকে বিভক্ত করার কৌশলেই আস্থা রেখে এসেছিলেন। আত্ম অহংকারে মত্ত এই বয়স্ক লোকগুলো ভেবেছিলেন, জনপ্রতিনিধিদের অপরাধ নাগরিকেরা চিরকাল হজম করে নেবে। কিন্তু এখন সেই সব অতীত পাপ ‘ককরোচ’ এর রূপ ধরে তাঁকে তাড়া করতে এসেছে। তিনি পুরো দিল্লিকে এক দুর্গে পরিণত করেছেন এবং নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর রাষ্ট্রের সব শক্তি প্রয়োগ করছেন। এটি তাঁর পুরোনো নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ—তিনি সব সময় শান্তির ভান করেন কিন্তু বাস্তবে কেবল সংঘাতের জন্ম দেন। ১০ অক্টোবরের এই আন্দোলন তো কেবল শুরু। সিজিপি এবং বিরোধীরা ঘোষণা দিয়েছে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। ইতিহাস মোদিকে সম্ভবত সেই ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করবে, যাঁর কারণে একটি পুরো প্রজন্ম সরকার, সেনাবাহিনী ও পুলিশ তথা পুরো শাসনব্যবস্থার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়েছে। এই ঝড়ের শেষে কী হবে, তা আজকের রাজপথে নেমে আসা তরুণরাই ভালো জানে, কারণ সব ক্ষমতার উৎস জনগণই।




























