দিল্লিতে হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঢাকার তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ

- আপডেট সময় : ১০:০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তি যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন, সে বিষয়ে গত ৩ আগস্ট ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। কিন্তু বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক সৌজন্য ও ভদ্রতাকে তুচ্ছ করে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে দিল্লি। ভারত সরকার প্রতিবেশী দেশটির সাথে তাদের সাধারণ সর্ম্পককেও অনেকটাই অস্বীকার করে শেখ হাসিনাকে এমন সময় সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ করে দিয়েছে, যখন বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ঐতিহাসিক জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বার্ষিকী উদযাপন করছিলেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সব ধরনের কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙে বুধবার দিল্লিতে ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’ (এফসিসি) নামক সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের ব্যানারে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। অথচ ২০১৮ সালের মার্চ মাসে উক্ত এফসিসি যখন এমন একটি সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিল, সেদিন অনিবার্য কারণ দেখিয়ে তা বাতিল করে ভারত সরকার। যার কারণে অনেক আগে নির্ধারিত হওয়া সত্ত্বেও বেগম জিয়ার সম্মানে সেই সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করা যায়নি। এমনকি তৎকালীন সময়ে বেগম জিয়ার আইনি পরামর্শক লর্ড আলেকজান্ডার কার্লাইলকে ভারতে ঢুকতে দেয়নি মোদি সরকার।
গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় নয়াদিল্লির মথুরা রোডে অবস্থিত স্যার মার্ক টুলি মিলনায়তনে শেখ হাসিনার পতনের দুই বছর পূর্তিতে তাঁকে এই সুযোগটি করে দিয়েছে এফসিসি। এর আগে গত ২৯ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতেও শেখ হাসিনার প্রসঙ্গটি তোলে বাংলাদেশ। তখন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ড যে অস্বস্তি কাটিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ‘নতুন শুরুর’ পথে বাধা, সেটা ওই দিন জোরালোভাবে তুলে ধরেন তিনি। পরে ঢাকায় নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে, সেদিন ভারতীয় মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক চরম অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি এক গুরুতর অসম্মান। বিবৃতিতে পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে বলে জানানো হয়। সেখানে তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেসের সহকারী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের (বিডস) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান হোসাইন আনসারী দৈনিক এদিনকে বলেন, ভারত একজন অভিযুক্ত আসামি ও একজন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে সংবাদ সম্মেলন করে কথা বলার সুযোগ দিয়ে যে দ্বিচারিতার নজির সৃষ্টি করেছে, বাংলাদেশ যে এটা খুব ভালোভাবে নেয়নি তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে খুবই তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে। ড. আনসারী আরও বলেন, ভারত এখানে ডাবল গেম খেলছে। তারা একদিকে দেখাতে চায় বিএনপির সরকারের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখতে চায়, আবার অন্যদিকে দরকষাকষির ক্ষেত্রে তারা আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে প্রাসঙ্গিক রাখতে চায়। এই ডাবল গেম ভারত গোপনে নয় প্রকাশ্যেই করে যাচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকার করাটা পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তাঁর অপরাধের সহযোগীদের ইতিহাসের গতিপথ উল্টে দেওয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে একটি গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। কিন্তু ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ করলেও এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি আসলে বাংলাদেশের মানুষের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক করতে চায় নাকি শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক রাখতে বেশি আগ্রহী? যদি মোদি সরকার তাদের অবস্থান না বদলায়, সেক্ষেত্রে আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্জনই হয়তো বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন হতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
























