ঢাকার আদালতে জাল সিল-স্বাক্ষরের ভয়ংকর প্রতারণা চক্র

- আপডেট সময় : ০৪:২৮:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার আদালতপাড়ায় এখন টাকা দিলেই মেলে বিচারকের স্বাক্ষর। আদালতের সিল, স্বাক্ষর আর নথি যেন হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে। টাকা প্রদানের বিনিময়ে তৈরি হচ্ছে আদালতের আদলে জাল নথি। গ্রেফতারি পরোয়ানা, সমন, নোটারি হলফনামা, কাবিননামা, এমনকি মামলার সার্টিফায়েড কপি বা নকলের কপিতেও বসানো হচ্ছে বিচারকের জাল স্বাক্ষর ও সিল। এসব নথি ব্যবহার করে চলছে প্রতারণা, হয়রানি এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার কারসাজি।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে ঢাকার অধস্তন আদালতকেন্দ্রিক এই সংঘবদ্ধ চক্রের নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে। আদালতের নথি, এজাহার ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আদালত প্রাঙ্গণের কিছু ফটোকপির দোকান, দালাল, অসাধু আইনজীবী এবং কিছু অসৎ কর্মচারীর যোগসাজশে এই চক্র গড়ে উঠেছে। চক্রটি এসব জাল নথি কখনো মানুষকে ভয় দেখাতে, কখনো মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে টাকা আদায়ে, আবার কখনো প্রতিপক্ষকে হয়রানির কাজে ব্যবহার করছে।
বিচারকের স্বাক্ষর জাল করে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ করানোর একটি ঘটনা সম্প্রতি সামনে এসেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ১১ নম্বর আদালতের বিচারক আরিফুল ইসলামের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে বরগুনার বামনা উপজেলার একটি সিআর মামলার নোটারি হলফনামা দাখিল করা হয়। সিএমএম আদালতের নেজারত শাখার রেজিস্টার যাচাই করে দেখা যায়, ওই স্মারক নম্বরে অন্য একজনের হলফনামা নিবন্ধিত রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় মামলা হয়েছে।
একইভাবে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর চার বাসিন্দার ক্ষেত্রে ভুয়া সমন তৈরির ঘটনা ধরা পড়ে। শাহবাগ থানার একটি মামলার কথা উল্লেখ করে তাদের আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, অথচ ওই মামলায় তাদের নামই ছিল না। এছাড়া উত্তরা পূর্ব থানার একটি প্রতারণা মামলায় দেখা যায়, মামলার এজাহারভুক্ত এক নারী আসামির পরিবর্তে অন্য এক নারী টাকার বিনিময়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যান। পরে তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আদালতের আশপাশের কিছু ফটোকপির দোকানে কম্পিউটারে নথির খসড়া তৈরি করা হয়। আদালতের অসাধু কর্মচারীদের মাধ্যমে আসল নথির নমুনা ও স্মারক নম্বর সংগ্রহ করে এই জাল নথিগুলো তৈরি করা হয়।
বিচারিক কার্যক্রম ডিজিটাইজেশন করার তাগিদ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের নথি জালিয়াতি ঠেকাতে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিচারিক কার্যক্রমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (এন্ড-টু-এন্ড) ডিজিটাইজেশনই এই জালিয়াতি বন্ধের কার্যকর উপায়। তিনি মনে করেন, বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করা শুধু অপরাধই নয়, এটি বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং বিভাগটিকে এক ধরনের জিম্মি অবস্থায় ফেলেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, জালিয়াতির কোনো ঘটনা নজরে এলে সঙ্গে সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নিয়মিত অভিযান চালানোর চেয়ে জড়িতদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করাই অপরাধ প্রতিরোধের কার্যকর উপায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।



























