হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র থাকা শিশুর যত্ন ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা

- আপডেট সময় : ০৩:৫৮:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে প্রতিহাজার জীবিত জন্মে প্রায় ১৯টি শিশু জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে পৃথিবীতে আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট বা অ্যাট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট নামে পরিচিত এই সমস্যায় আক্রান্ত শিশুরা হৃদরোগের শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভোগে। হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র থাকার কারণে শরীরে রক্ত সঠিকভাবে পাম্প হতে পারে না, ফলে হৃৎপিণ্ডকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এতে শরীরের প্রচুর শক্তি ক্ষয় হয় এবং সুস্থ শিশুর তুলনায় তাদের ক্যালোরির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। অথচ শারীরিক দুর্বলতা, দুধ টানতে কষ্ট হওয়া এবং দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ার কারণে তাদের খাওয়ার ক্ষমতা কমে যায়, যা পুষ্টিহীনতাকে আরও প্রকট করে তোলে।
বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে মা শিশুর হৃদরোগ সম্পর্কে অবগত থাকেন না, আবার অনেকে জানলেও খাদ্যাভ্যাসে কী পরিবর্তন প্রয়োজন তা বুঝতে পারেন না। ফলে শিশুর ওজন কমতে থাকে, বারবার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে মায়ের দুধের গুরুত্ব অপরিসীম। মা পুষ্টিকর খাবার খেলে বুকের দুধের গুণগত মান ভালো হয়, যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। শিশু সরাসরি দুধ টানতে না পারলে এক্সপ্রেসড ব্রেস্ট মিল্ক চামচ বা কাপে খাওয়ানো যেতে পারে। ছয় মাস বয়স পার হলে প্রোটিন ও ক্যালোরিতে ভরপুর শক্ত খাবার শুরু করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ডিম, মুরগির মাংস, ছোট মাছ, সয়াবিন, ডাল, চিনাবাদাম এবং দই কার্যকর প্রোটিনের উৎস হিসেবে কাজ করে। ভাতের সঙ্গে ঘি বা সরিষার তেল মিশিয়ে ক্যালোরির ঘনত্ব বাড়ানো যায়। এছাড়া কলা, মিষ্টিআলু, কাঁঠাল ও পাকা পেঁপে শক্তির ভালো উৎস এবং পালংশাক বা পুঁইশাক রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সহায়ক।
এসব শিশুকে একবারে বেশি না খাইয়ে দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার অল্প অল্প করে ঘন ও নরম খাবার দেওয়া উচিত। অতিরিক্ত তরল খাবার পেট ভরালেও পর্যাপ্ত ক্যালোরি দেয় না, তাই শক্ত বা আধাশক্ত খাবারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। হৃদরোগী শিশুদের জন্য লবণ ও চিনি অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্যাকেটজাত খাবার, চিপস, ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও বাজারের মিষ্টি পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ ইলিশ, রুই, কাতলা ও সামুদ্রিক মাছ হৃৎপিণ্ডের প্রদাহ কমাতে ও রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে। এছাড়া কলিজা ও ডিমের কুসুমের মতো আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে লেবু বা আমলকীর মতো ভিটামিন ‘সি’ যুক্ত খাবার খাওয়ালে শরীর সহজেই আয়রন শোষণ করতে পারে।
চিকিৎসার বিশাল খরচ অনেক পরিবারকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি পুষ্টি কর্মসূচি, শিশু হাসপাতাল এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট বা বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। অস্ত্রোপচারের আগে শিশুর শারীরিক পুষ্টি যত ভালো থাকবে, অস্ত্রোপচারের ফলাফল তত কার্যকর হবে এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। সঠিক পুষ্টি ও সচেতনতাই পারে হার্টে ছিদ্র নিয়ে জন্মানো শিশুকে একটি সুস্থ জীবনের পথ দেখাতে।
একজন সচেতন মা ও সচেতন পরিবারই পারে হার্টে ছিদ্র নিয়ে জন্মানো শিশুকে একটি সুন্দর ও সুস্থ ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।লেখক : স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক এবং প্রতিষ্ঠাতা, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাথওয়েজইমেইল : ধসরসঁহধ১০@মসধরষ.পড়স





























