এলপিজির বাজারে সংকট ও বাড়তি দাম, সিলিন্ডারপ্রতি গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা
- আপডেট সময় : ০৮:০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

সরকার নির্ধারিত মূল্যে সমন্বয় করার পরও বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহসংকট কাটেনি। পরিবেশকদের ভাষ্যমতে, বর্তমানে মাত্র ছয়টি কোম্পানি নিয়মিত সরবরাহ করছে, তবে তাদের কাছেও চাহিদামতো এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাজারে এখনো ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বাড়তি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ৪ অক্টোবর এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করে। সংস্থাটি অক্টোবরের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে দেয়, যেখানে গত মাসে এই দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে বাস্তবে বাজারে এই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
এই বাড়তি দামে বিক্রির বিষয়ে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি গত ৬ অক্টোবর বিইআরসিকে একটি চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, বিইআরসি দাম নির্ধারণের দিন সন্ধ্যা থেকেই কোম্পানিগুলো নতুন মূল্যতালিকা দিয়েছে, যেখানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, লাইসেন্স ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ার কারণে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যবসায়ী সমিতির হিসাব অনুযায়ী, সিলিন্ডারপ্রতি পরিবেশকের গোডাউন পর্যন্ত আনতে ভাড়া ৫০ টাকা, ট্রাকে ওঠানো-নামানো ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে খরচ ৩৫ টাকা এবং কর্মচারী, গোডাউন ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও লাইসেন্স ফি বাবদ আরও ২৫ টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা যোগ করলে পরিবেশক পর্যায়ে ১৫০ টাকা প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে তারা মাত্র ৫০ টাকা কমিশন পাচ্ছে, ফলে সিলিন্ডারপ্রতি ১০০ টাকা ঘাটতি থাকছে। সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান স্বাক্ষরিত এই চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তারা চিঠি পেয়েছেন, তবে গণশুনানি ছাড়া খরচ সমন্বয়ের সুযোগ নেই। আগামী রোববার কমিশন সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে করণীয় ঠিক করা হবে। তবে নতুন সিদ্ধান্তের আগপর্যন্ত নির্ধারিত দামে বিক্রির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বিইআরসির তথ্যমতে, পাইকারি পর্যায়ে নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৭৪২ টাকা এবং পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকা ধরে খুচরা বিক্রেতার কাছে ১ হাজার ৭৯২ টাকায় বিক্রির কথা।
মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা তামান্না আখতার জানান, গত বুধবার ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে, যা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬৬৩ টাকা বেশি। এলপিজি ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির মহাসচিব হাসিন পারভেজ জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ খুবই কম। একটি স্টেশনে মাসে ৩০ টন চাহিদা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ টন, ফলে স্টেশনগুলো লোকসানের মুখে।
দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করে, যার ৮০ শতাংশই গৃহস্থালি রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। ২০১৫ সালে আবাসিকে গ্যাস-সংযোগ বন্ধের পর থেকে এর চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে এবং বর্তমানে বার্ষিক চাহিদা ১৫ লাখ টনের বেশি। এলপিজি আমদানি ও সরবরাহকারী ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াব জানিয়েছে, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা স্বাভাবিক। সরবরাহ বাড়তে আরও সময় লাগতে পারে বলে সংগঠনটি মনে করছে।
এদিকে, বাড়তি দাম ঠেকাতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সারা দেশে অভিযান চালাচ্ছে। সংস্থাটির পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানান, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ২৪২টি অভিযানে ৪৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কিছু কোম্পানি এলপিজি সরবরাহ না করলেও ১ হাজার ৯৬০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যতালিকা দিয়ে রেখেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা লোকসান হবে, তাই তারা বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। বিইআরসি দাবি না মানলে তারা এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার কথাও চিন্তা করছেন।




























