মেট্রোরেলের আকাশচুম্বী ব্যয় ও অতিমূল্যায়িত প্রকল্পের ফাঁদ
- আপডেট সময় : ১২:০০:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

গত ৩০ আগস্ট প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন দুটি মেট্রোলাইন নির্মাণের জন্য ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ এই প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক প্রাক্কলন ছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কাজ শুরুর আগেই ব্যয় বৃদ্ধির এই হার শতভাগের বেশি, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সরকার গঠিত কারিগরি কমিটি এই ব্যয় বৃদ্ধিকে যৌক্তিক বলে প্রতিবেদন দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন।
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে অতিমূল্যায়িত প্রকল্পের সংস্কৃতিতে দেশ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, এলিভেটেড এমআরটি লাইন-৬ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যেখানে দিল্লি মেট্রো নির্মিত হয়েছে প্রতি কিলোমিটার প্রায় ৩০০ কোটি টাকায়। পদ্মা সেতুর রেলসংযোগের ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা প্রতি কিলোমিটারে ২৩২ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রেলের আয় থেকে এই বিশাল ঋণের সুদ পরিশোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এছাড়া কুড়িল থেকে কাঞ্চন পর্যন্ত ৩০০ ফুট রাস্তার নির্মাণ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ১৪ লেন পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির জন্য তা ভেঙে ফেলা হয়, যাতে আনুমানিক ২০-২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে শোনা যায়।
মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ঋণদাতা জাইকা। জাইকার অর্থায়নে করা প্রকল্পে পরামর্শক ও ঠিকাদার উভয়ই জাপানি হওয়ায় ঠিকাদারদের মধ্যে একধরনের যোগসাজশ কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নকশা পরিবর্তন করে ব্যয় বাড়িয়ে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, জাইকার ঋণের শর্তাবলি এবং দরপত্র দলিলে এমন সব প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকে যা কেবল জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোই পূরণ করতে পারে। বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং এমআরটি-৬ প্রকল্পে পাইলিং প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের নজির রয়েছে।
মেট্রোরেল নগরবাসীর জন্য প্রয়োজনীয় হলেও ঢাকার যানজট নিরসনে এটি একমাত্র সমাধান নয়। বর্তমানে এমআরটি-৬ লাইনের দৈনিক যাত্রী মাত্র ৩ লাখ ৮২ হাজার, যেখানে বাসে যাতায়াত করেন এক কোটি মানুষ। যানজটের মূল কারণ বাস মালিক ও চালকদের অরাজকতা এবং ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল।
শহর বাঁচাতে করণীয় হিসেবে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন লেখক। প্রথমত, বর্তমান মেট্রোরেল প্রকল্পটি বাতিল করে জাইকাকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনীয় ব্যয়ে প্রকল্প নিয়ে আসার আহ্বান জানানো উচিত। চীনা ঋণে এই রেললাইন তৈরি হয়েছে, চীনারা নিজ দেশে ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে চলার রেললাইন বানায় এই দরে। দ্বিতীয়ত, লাভজনক ব্যবসার চিন্তা বাদ দিয়ে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ২৫ হাজার কোটি টাকায় ৫ হাজার বৈদ্যুতিক বাস নামানো সম্ভব। ২৫০ কিলোমিটার চলার জন্য একটি বাসকে চার্জ করতে লাগবে ৫ ঘণ্টা, রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে তা করা সম্ভব। কমবেশি ১৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা লাগবে একসঙ্গে ৫ হাজার বাস চার্জ করার জন্য। তৃতীয়ত, ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা সীমিত করে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। চতুর্থত, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।





























