ঢাকা ১১:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রুশ-ইউক্রেন পাল্টাপাল্টি হামলায় নিহত ১০, পুতিনের সঙ্গে রফার আহ্বান ট্রাম্পের নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় সাইকেল আরোহী আবু সাইদ নিহত ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেনের ঐতিহাসিক জয় রোনালদোর গ্যারেজে থাকা দুর্লভ বুগাত্তি ও তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার শাহজালালে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদলের মধ্যরাতে বিক্ষোভ বিশ্ব পর্যটন দিবস: ডিজিটাল ও এআই প্রযুক্তিতে সাজছে বাংলাদেশের পর্যটন বিশ্বমঞ্চে নজর কাড়ল চীনা ফার্স্টলেডি পং লিউয়ানের গ্ল্যামার ও সফট পাওয়ার হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট: ১০ হাজার কোটি রুপির সম্পদ নিয়ে শীর্ষে শাহরুখ সপ্তাহের শুরুতে শেয়ারবাজার, মুদ্রা ও নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নেপালে বন্যায় মৃত বেড়ে ১৪৫৩, নিখোঁজ এখনো প্রায় ৬ হাজার

পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন: তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবধান

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১০:১৬:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পাকিস্তানের দুটি খবর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ১৮ আগস্ট ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে গুগল পাকিস্তানে তাদের প্রথম নিজস্ব অফিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছে। প্রায় একই সময়ে জানা গেল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তানের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৪৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। নতুন অর্থবছরের জুলাইয়েও রপ্তানি হয়েছে ৪১৭ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি।

এই সংখ্যাটি বাংলাদেশের পাশে রাখা যায়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের হিসাবে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি প্রায় ৭০৩ মিলিয়ন ডলার; রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবেও তা প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন। যদিও সংজ্ঞা ও হিসাবের পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে, তবুও ব্যবধানটি যে বড়, তাতে সন্দেহ নেই। অথচ ২০১০ সালে বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী এই খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৩১৩ মিলিয়ন ডলার, আর পাকিস্তানের ছিল ৪৩৪ মিলিয়ন। দেড় দশক পরে পাকিস্তান ৪৬০ কোটি ডলারের ঘরে পৌঁছেছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কেন পারলাম না?

এই প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দুই দেশেই তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন প্রায় একই সময়ে গড়ে উঠেছে। পাকিস্তান সরকার ১৯৯৫ সালে পাকিস্তান সফটওয়্যার এক্সপোর্ট বোর্ড (পিএসইবি) প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালে এক বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য সামনে রেখে ১৮টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বেসিস গঠিত হয়।

পাকিস্তানের আজকের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বুঝতে হলে ২০০২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের জায়গায় গঠিত শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) এবং অধ্যাপক আতাউর রহমানের নেতৃত্বের কথা বলতে হবে। তাঁর সময়ে গবেষণার মান ও কাজের ফলের সঙ্গে শিক্ষক-গবেষকদের বেতন ও পেশাগত অগ্রগতি যুক্ত করা হয়। এছাড়া ২০০৩ সালে লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজ ইউনিভার্সিটিতে গড়ে ওঠা আবদুস সালাম স্কুল অব ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেস অবকাঠামোর চেয়ে মানুষ ও গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে জোর দেয়। ২০১৪ সালের শুরুর মধ্যেই তারা শতাধিক পিএইচডি তৈরি করে। এই মেধা তৈরির ধারার সাম্প্রতিক প্রতীক সুয়ালেহ আসিফ, যে এমআইটিতে পড়তে গিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে গড়ে তোলে অ্যানিস্ফিয়ার ও কার্সর। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি এটি আত্তীকরণ করেছে, যা প্রমাণ করে পাকিস্তানি মেধা বিশ্বমানের পরিবেশ পেলে কোথায় যেতে পারে।

আমাদের সমস্যা শুধু মেধার ঘাটতি নয়, কারণ আমাদের বহু প্রকৌশলী গুগল, মেটাসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। প্রশ্ন হলো, সেই মেধাকে বাংলাদেশে বসেই বড় প্রতিষ্ঠান ও রপ্তানি আয়ে রূপান্তর করতে আমরা কতটা পারছি? পিএসইবির কাজের কেন্দ্রেই রয়েছে রপ্তানি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পিএসইবি ৩০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে ২০টি বড় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি আয়োজনে নিয়ে গেছে। সৌদি আরবে সমাপ্ত হওয়া এলইএপি সম্মেলনে পাকিস্তানের শতাধিক প্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন এবং সেখানে ছিল পাকিস্তানের আলাদা রাষ্ট্রীয় প্যাভিলিয়ন। এসবের ফলে সেখান থেকে ৪ হাজার ২২৮টি সম্ভাব্য ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা এসেছে বলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থের সহজ চলাচলেও তারা সমস্যাটি ধরেছে। তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানিকারক ও মুক্ত পেশাজীবীরা রপ্তানি আয়ের বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে রাখতে এবং ব্যবসার প্রয়োজনে বিদেশে অর্থ পাঠাতে পারেন। পিএসইবি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমস্যাটি স্বীকার করে প্রক্রিয়া সহজ করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানে এখনো পেপ্যাল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু নেই এবং ইন্টারনেটের মান নিয়েও অভিযোগ আছে। অর্থাৎ সব সমস্যা মিটে যাওয়ার পর তাদের রপ্তানি বাড়েনি; সীমাবদ্ধতার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জায়গা ঠিক করা হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পাকিস্তানের মুক্ত পেশাজীবীদের বৈদেশিক মুদ্রা আয় ছিল ৮৫৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫১ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ডিজিস্কিলস কর্মসূচিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণসহ নানা বিষয়ে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তারা ৫১ লাখের বেশি প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বাংলাদেশেও লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের মতো অনেক প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষণের মান ও কতজন নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও পার্থক্য চোখে পড়ে। বাংলাদেশে হাইটেক পার্ক বলতে আমরা বড় জমি ও নতুন ভবন বুঝেছি। পাকিস্তানের পিএসইবি অনেক সফটওয়্যার প্রযুক্তি পার্ক করেছে বিদ্যমান অফিস ভবন, কারখানা বা গুদামকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে রূপান্তর করে। এখন ৫০টির বেশি এমন পার্কে ৩৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এছাড়া জাপানের জেট্রোর মতো মডেল থেকে শিখে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি বাজারে স্থানীয় পরামর্শক বা ব্যবসায়িক ঠিকানা দেওয়ার ব্যবস্থা করা খুবই দরকার।

গুগলের অফিস খোলার তিন দিন পর পাকিস্তান সরকার ও গুগল একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এর আওতায় ইসলামাবাদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–বিষয়ক উৎকর্ষকেন্দ্র ও ২০২৬ সালে দেড় লাখ কর্মীকে গুগল পেশাগত সনদ দেওয়ার কথা রয়েছে। গুগলের অফিসের কারণে পাকিস্তানের রপ্তানি ৪৬০ কোটি ডলার হয়নি, বরং বাজার ও দক্ষ জনশক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের শিল্পনেতারাও আত্মতুষ্ট নন, তাঁরা ভাবছেন কীভাবে ১৫ বিলিয়নে যাওয়া যায়।

বাংলাদেশে গত দেড় দশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ, দক্ষতা উন্নয়ন, হাইটেক পার্কসহ অনেক কাজ হয়েছে। কাজেই ‘আমরা কিছুই করিনি’ বলা অন্যায্য। আমার প্রশ্ন সমন্বয়ের। তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি বাড়ানোর একক, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য কী? সেই সংখ্যাটির দায়িত্ব কার? প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদেরও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। সব সমস্যার ব্যাখ্যা ‘ভালো প্রকৌশলী নেই’ বা ‘সরকার সহায়তা করছে না’ দিয়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বিক্রয়, দীর্ঘমেয়াদি বাজার তৈরি ও বিদেশে উপস্থিতির জন্য আমাদের উদ্যোক্তারা নিজেরা কতটা বিনিয়োগ করছি—এ প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকার সহায়ক নীতি ও অর্থ লেনদেনের পথ সহজ করবে; কিন্তু বিদেশে ক্রেতা খোঁজা, সম্পর্ক তৈরি ও প্রতিষ্ঠান বড় করার বড় অংশটি শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতকেই করতে হবে।

২০১০ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। ২০২৬ সালে পাকিস্তান ৪৬০ কোটি ডলারের তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি এবং সামনে আরও বড় লক্ষ্যের কথা বলছে। আমাদেরও নতুন করে জিজ্ঞাসা করা দরকার—পরবর্তী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের লক্ষ্য কত এবং সেখানে পৌঁছানোর দায়িত্ব কার? সম্প্রতি নেপালও নিজেদের তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য ও সেবা রপ্তানি বাড়াতে উঠেপড়ে লেগেছে। তিন বছর পর যেন আবার লিখতে না হয়—ছোট্ট নেপালও পারল, আমরা তো আর পারলাম না।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন: তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবধান

আপডেট সময় : ১০:১৬:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পাকিস্তানের দুটি খবর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ১৮ আগস্ট ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে গুগল পাকিস্তানে তাদের প্রথম নিজস্ব অফিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছে। প্রায় একই সময়ে জানা গেল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তানের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৪৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। নতুন অর্থবছরের জুলাইয়েও রপ্তানি হয়েছে ৪১৭ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি।

এই সংখ্যাটি বাংলাদেশের পাশে রাখা যায়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের হিসাবে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি প্রায় ৭০৩ মিলিয়ন ডলার; রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবেও তা প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন। যদিও সংজ্ঞা ও হিসাবের পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে, তবুও ব্যবধানটি যে বড়, তাতে সন্দেহ নেই। অথচ ২০১০ সালে বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী এই খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৩১৩ মিলিয়ন ডলার, আর পাকিস্তানের ছিল ৪৩৪ মিলিয়ন। দেড় দশক পরে পাকিস্তান ৪৬০ কোটি ডলারের ঘরে পৌঁছেছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কেন পারলাম না?

এই প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দুই দেশেই তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন প্রায় একই সময়ে গড়ে উঠেছে। পাকিস্তান সরকার ১৯৯৫ সালে পাকিস্তান সফটওয়্যার এক্সপোর্ট বোর্ড (পিএসইবি) প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালে এক বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য সামনে রেখে ১৮টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বেসিস গঠিত হয়।

পাকিস্তানের আজকের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বুঝতে হলে ২০০২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের জায়গায় গঠিত শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) এবং অধ্যাপক আতাউর রহমানের নেতৃত্বের কথা বলতে হবে। তাঁর সময়ে গবেষণার মান ও কাজের ফলের সঙ্গে শিক্ষক-গবেষকদের বেতন ও পেশাগত অগ্রগতি যুক্ত করা হয়। এছাড়া ২০০৩ সালে লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজ ইউনিভার্সিটিতে গড়ে ওঠা আবদুস সালাম স্কুল অব ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেস অবকাঠামোর চেয়ে মানুষ ও গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে জোর দেয়। ২০১৪ সালের শুরুর মধ্যেই তারা শতাধিক পিএইচডি তৈরি করে। এই মেধা তৈরির ধারার সাম্প্রতিক প্রতীক সুয়ালেহ আসিফ, যে এমআইটিতে পড়তে গিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে গড়ে তোলে অ্যানিস্ফিয়ার ও কার্সর। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি এটি আত্তীকরণ করেছে, যা প্রমাণ করে পাকিস্তানি মেধা বিশ্বমানের পরিবেশ পেলে কোথায় যেতে পারে।

আমাদের সমস্যা শুধু মেধার ঘাটতি নয়, কারণ আমাদের বহু প্রকৌশলী গুগল, মেটাসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। প্রশ্ন হলো, সেই মেধাকে বাংলাদেশে বসেই বড় প্রতিষ্ঠান ও রপ্তানি আয়ে রূপান্তর করতে আমরা কতটা পারছি? পিএসইবির কাজের কেন্দ্রেই রয়েছে রপ্তানি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পিএসইবি ৩০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে ২০টি বড় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি আয়োজনে নিয়ে গেছে। সৌদি আরবে সমাপ্ত হওয়া এলইএপি সম্মেলনে পাকিস্তানের শতাধিক প্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন এবং সেখানে ছিল পাকিস্তানের আলাদা রাষ্ট্রীয় প্যাভিলিয়ন। এসবের ফলে সেখান থেকে ৪ হাজার ২২৮টি সম্ভাব্য ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা এসেছে বলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থের সহজ চলাচলেও তারা সমস্যাটি ধরেছে। তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানিকারক ও মুক্ত পেশাজীবীরা রপ্তানি আয়ের বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে রাখতে এবং ব্যবসার প্রয়োজনে বিদেশে অর্থ পাঠাতে পারেন। পিএসইবি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমস্যাটি স্বীকার করে প্রক্রিয়া সহজ করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানে এখনো পেপ্যাল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু নেই এবং ইন্টারনেটের মান নিয়েও অভিযোগ আছে। অর্থাৎ সব সমস্যা মিটে যাওয়ার পর তাদের রপ্তানি বাড়েনি; সীমাবদ্ধতার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জায়গা ঠিক করা হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পাকিস্তানের মুক্ত পেশাজীবীদের বৈদেশিক মুদ্রা আয় ছিল ৮৫৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫১ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ডিজিস্কিলস কর্মসূচিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণসহ নানা বিষয়ে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তারা ৫১ লাখের বেশি প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বাংলাদেশেও লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের মতো অনেক প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষণের মান ও কতজন নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও পার্থক্য চোখে পড়ে। বাংলাদেশে হাইটেক পার্ক বলতে আমরা বড় জমি ও নতুন ভবন বুঝেছি। পাকিস্তানের পিএসইবি অনেক সফটওয়্যার প্রযুক্তি পার্ক করেছে বিদ্যমান অফিস ভবন, কারখানা বা গুদামকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে রূপান্তর করে। এখন ৫০টির বেশি এমন পার্কে ৩৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এছাড়া জাপানের জেট্রোর মতো মডেল থেকে শিখে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি বাজারে স্থানীয় পরামর্শক বা ব্যবসায়িক ঠিকানা দেওয়ার ব্যবস্থা করা খুবই দরকার।

গুগলের অফিস খোলার তিন দিন পর পাকিস্তান সরকার ও গুগল একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এর আওতায় ইসলামাবাদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–বিষয়ক উৎকর্ষকেন্দ্র ও ২০২৬ সালে দেড় লাখ কর্মীকে গুগল পেশাগত সনদ দেওয়ার কথা রয়েছে। গুগলের অফিসের কারণে পাকিস্তানের রপ্তানি ৪৬০ কোটি ডলার হয়নি, বরং বাজার ও দক্ষ জনশক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের শিল্পনেতারাও আত্মতুষ্ট নন, তাঁরা ভাবছেন কীভাবে ১৫ বিলিয়নে যাওয়া যায়।

বাংলাদেশে গত দেড় দশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ, দক্ষতা উন্নয়ন, হাইটেক পার্কসহ অনেক কাজ হয়েছে। কাজেই ‘আমরা কিছুই করিনি’ বলা অন্যায্য। আমার প্রশ্ন সমন্বয়ের। তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি বাড়ানোর একক, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য কী? সেই সংখ্যাটির দায়িত্ব কার? প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদেরও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। সব সমস্যার ব্যাখ্যা ‘ভালো প্রকৌশলী নেই’ বা ‘সরকার সহায়তা করছে না’ দিয়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বিক্রয়, দীর্ঘমেয়াদি বাজার তৈরি ও বিদেশে উপস্থিতির জন্য আমাদের উদ্যোক্তারা নিজেরা কতটা বিনিয়োগ করছি—এ প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকার সহায়ক নীতি ও অর্থ লেনদেনের পথ সহজ করবে; কিন্তু বিদেশে ক্রেতা খোঁজা, সম্পর্ক তৈরি ও প্রতিষ্ঠান বড় করার বড় অংশটি শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতকেই করতে হবে।

২০১০ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। ২০২৬ সালে পাকিস্তান ৪৬০ কোটি ডলারের তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি এবং সামনে আরও বড় লক্ষ্যের কথা বলছে। আমাদেরও নতুন করে জিজ্ঞাসা করা দরকার—পরবর্তী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের লক্ষ্য কত এবং সেখানে পৌঁছানোর দায়িত্ব কার? সম্প্রতি নেপালও নিজেদের তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য ও সেবা রপ্তানি বাড়াতে উঠেপড়ে লেগেছে। তিন বছর পর যেন আবার লিখতে না হয়—ছোট্ট নেপালও পারল, আমরা তো আর পারলাম না।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo