চুয়েটে উপাচার্য নিয়োগের আড়ালে কী চলছে: আইনি মারপ্যাঁচ ও ক্ষোভ
- আপডেট সময় : ০৬:০১:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

চুয়েটে উপাচার্য নিয়োগ ও অব্যাহতি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও স্বকীয়তাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) মধ্যে উপাচার্য ও সহ-উপাচার্য পদের রদবদল এবং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাগুলো উচ্চশিক্ষালয়ের নেতৃত্ব নির্ধারণে এক ধরনের ‘ভেলকিবাজি’র চিত্র তুলে ধরছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছর কুয়েতে এক শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ সময় ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকার পর শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের মুখে ওই বছরের ২৫ এপ্রিল কুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য ড. মুহাম্মদ মাছুদ এবং সহ-উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলমকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হযরত আলীকে কুয়েতের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য করা হলেও মাত্র এক মাসের মাথায় তিনিও অব্যাহতি পান। অথচ, কুয়েটের সেই বিবাদের ঘটনায় অব্যাহতি পাওয়া সাবেক সহ-উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলমকেই সম্প্রতি চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে চুয়েটের নিজস্ব চিত্রটিও বেশ নাটকীয়। চলতি বছরের ২৭ জুলাই চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে ওই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়ার নিয়ম থাকা সত্ত্বেও ঠিক কী কারণে অধ্যাপক আবু সাদাতকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং অধ্যাপক আবু সাদাতকে চুয়েটের উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে লাগাতার আন্দোলন করছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠিও পাঠিয়েছেন।
চুয়েট আইন অনুযায়ী এই নিয়োগ ও অব্যাহতির আইনি ভিত্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৩-এর ১০(১) ধারা অনুযায়ী চ্যান্সেলর বা আচার্য প্রকৌশল শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশল শিক্ষাবিদকে চার বছরের মেয়াদের জন্য উপাচার্য পদে নিয়োগ দেবেন। আবার ১০(৩) ধারায় বলা হয়েছে, উপাচার্যের পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন উপাচার্য দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর সেই দায়িত্ব পালন করবেন। তবে আইনের ১০(২) ধারায় আচার্যকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই উপাচার্যকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। মূলত এই ধারাটি ব্যবহার করেই অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আইনি ক্ষমতা থাকলেও মাত্র দুই মাসের মাথায় কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া একজন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল করার পেছনে কোনো বিশেষ মহলের রাজনৈতিক প্রভাব ও কলকাঠি নাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য ও শত শত অধ্যাপককে উপেক্ষা করে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্বকীয়তা ও স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ণ করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কুয়েটের সহ-উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া একজন শিক্ষককে চুয়েটের অভিভাবক হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য শিক্ষার্থীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে ক্যাম্পাসে সশরীরে উপস্থিত না হয়ে ভার্চ্যুয়ালি চুয়েটে যোগ দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা তাঁকে প্রশাসনিক দায়িত্বে চাচ্ছেন না, সেখানে তাঁর এই পদে থাকার অনড় অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে চুয়েটের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই স্বেচ্ছাচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করে রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় অনুরাগী যোগ্য শিক্ষকদের প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়ার দাবি এখন সময়ের দাবি।





























