সাগর পথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা ও সাইবার প্রতারণায় বাড়ছে মানব পাচার

- আপডেট সময় : ০৭:৫১:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

উন্নত জীবনের স্বপ্ন এবং বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে পড়ে বাংলাদেশের শত শত তরুণ পাচারকারীদের ভয়াবহ ফাঁদে আটকা পড়ছেন। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন তারা। গত কয়েক বছর ধরে এই পথে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করায় নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। পাচারকারীরা এখন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ভুয়া ওয়েবসাইট ও অনলাইন বিজ্ঞাপনের মতো প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল ব্যবহার করে নতুন যাত্রী সংগ্রহ করছে।
এ বছরের মার্চ মাসে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। তোবরুক থেকে রওনা হওয়া নৌকাটি দিক হারিয়ে ছয়দিন খাদ্য ও পানিশূন্য অবস্থায় ভেসে ছিল এবং পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এছাড়া লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি বাংলাদেশিদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং লিবিয়া থেকে গ্রিসে গেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ ১০-১২টি জেলা থেকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানব পাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরনো মামলাসহ ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচার ও তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।
অনিয়মিত অভিবাসনের পাশাপাশি নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে সাইবার স্ক্যাম। আইটি বা কল সেন্টারে চাকরির প্রলোভনে তরুণ-তরুণীদের কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে নিয়ে পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণায় যুক্ত করা হচ্ছে। বিএমইটি’র তথ্যমতে, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গেছেন, যার মধ্যে ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে ফিরে আসাদের ৯৮ শতাংশই কোনো চাকরি পাননি এবং ৯০ শতাংশকে জোর করে স্ক্যাম সেন্টারে যুক্ত করা হয়েছিল। চলতি বছরের জুন মাসে কম্বোডিয়ায় অভিযান চালিয়ে ৫৮৩ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল পালিত হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস’। ২০১৩ সালের ১৮ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০শে জুলাইকে এই দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’। ব্র্যাক’র সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, সাইবার স্ক্যাম এখন মানব পাচারের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপে পরিণত হয়েছে। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরি, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং ভিসার সত্যতা সরকারি মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
লিবিয়ায় নির্যাতন, রাশিয়ার যুদ্ধ, নারী ও রোহিঙ্গা পাচার: ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ব্র্যাক’র গবেষণা অনুযায়ী, ৯৩ শতাংশ ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৬৯ শতাংশ চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়েছেন। সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক অবৈধ দালাল চক্রকে সতর্ক করে বলেছেন, তাদের নজরদারি করা হচ্ছে এবং রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই।


























