গাফিলতি যেভাবে মানুষের জীবন ও সময়কে ধ্বংস করে
- আপডেট সময় : ০৭:৫৭:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

মানুষের মন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয় এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে তা বদলে যায়। তাই মনের সঠিক যত্ন, নজরদারি, শিক্ষা এবং নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, 'পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে ও প্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস' (সুরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)।
হৃদয়ের এই পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলতেন, আদম সন্তানের হৃদয় ফুটন্ত হাঁড়ির পানির মতো বারবার উল্টে-পাল্টে যায়। এজন্যই কবিরা মানুষকে 'ইনসান' বা বিস্মরণশীল প্রাণী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) প্রায়ই এই দোয়াটি করতেন, 'হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের ওপর স্থির রাখো।' যখন তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি জানান, মানুষের হৃদয় আল্লাহর আঙুল দুটির মাঝে থাকে, তিনি যাকে ইচ্ছা দৃঢ় রাখেন আবার যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করে দেন (তিরমিজি : ৩৫২২)।
জীবনের অন্যতম বড় বিপদ হলো গাফিলতি বা উদাসীনতা। এটি মানুষের সময় অপচয় করে, শক্তি নিঃশেষ করে এবং হৃদয়কে মৃত করে দেয়। গাফলতের অর্থ হলো আল্লাহকে ভয় না করা, ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং পরকালের হিসাবের জন্য প্রস্তুতি না নেওয়া। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার বহু নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল' (সুরা ইউনুস : ৯২)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, 'কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। এরা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্পর্কে অবগত, আর আখেরাত সম্বন্ধে এরা গাফিল। এরা কি নিজেদের অন্তরে ভেবে দেখে না? আল্লাহ আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও এদের অন্তর্র্বতী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং এক নির্দিষ্ট কালের জন্যে। কিন্তু মানুষের মধ্যে অনেকেই তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাতে অবিশ্বাসী' (সুরা রুম : ৬-৮)।
শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং মানুষের অলসতা গাফলতের বড় কারণ। যারা তাকওয়ার অধিকারী, তারা শয়তানের প্ররোচনায় পড়লে তাৎক্ষণিক আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেদের চোখ খুলে ফেলে। অথচ গাফিল মানুষ তাওবা পিছিয়ে দেয় এবং মনে করে হাতে অনেক সময় আছে। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি নিয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন যার ব্যাপারে মানুষ প্রতারিত হয়—সুস্থতা ও অবসর (বোখারি : ৬৪১২)। কিয়ামতের দিনে মানুষকে তার যৌবন ও জীবন কোথায় ব্যয় করেছে, সে বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে (তিরমিজি : ২৪১৬)।
গাফলতের আরেকটি বড় কারণ হলো উদাসীন সঙ্গীদের সাথে মেলামেশা। কুরআনুল কারিমে আল্লাহতায়ালা নবী (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন তাদের সংসর্গ ত্যাগ করতে, যারা তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর স্মরণে অমনোযোগী (সুরা কাহফ : ২৮)। বর্তমান যুগে মোবাইল, টিভি ও স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি গাফলতের অন্যতম বড় দ্বার। মানুষ এগুলোর মাধ্যমে সময় নষ্ট করে, বিভ্রান্তিকর ও গুনাহের দৃশ্যে ডুবে থাকে, ফলে কুরআন পাঠ বা জ্ঞানচর্চার সময় পায় না। আল্লাহ আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, 'মানুষের হিসেব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু এরা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। যখনই এদের কাছে এদের প্রতিপালকের কোন নূতন উপদেশ আসে এরা তা শ্রবণ করে কৌতুকচ্ছলে, এদের অন্তর থাকে অমনোযোগী' (সুরা আম্বিয়া : ১-৩)।
শয়তানের কুমন্ত্রণা মানুষের জন্য নির্ধারিত পরীক্ষা। ভুলে যাওয়া কিংবা অলসতা মানুষের দুর্বলতার কারণে হতে পারে। কিন্তু যদি কেউ বারবার এতে ডুবে থাকে ও অবহেলা করতে থাকে, তবে তা বড় বিপদ। তাই কোনো মুমিন যদি গাফলতের মধ্যে পড়ে যায়, তবে তাকে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে, তাওবা করতে হবে, শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে ও তার কুমন্ত্রণা প্রতিহত করতে হবে। হৃদয়কে জাগাতে হবে, শয়তান যেন পুরোপুরি দখল করতে না পারে। মহান আল্লাহ বলেন, 'যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে তবে আল্লাহর শরণ নেবে; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। যারা তাকওয়ার অধিকারী হয় তাদেরকে শয়তান যখন কুমন্ত্রণা দেয় তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, আর তৎক্ষণাৎ তাদের চোখ খুলে যায়। তাদের সঙ্গী-সাথিরা তাদেরকে ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয় এবং এ বিষয়ে তারা কোন ত্রুটি করে না।' (সুরা আরাফ : ২০০-২০২)।
গাফলতের অন্যতম কারণ হলো আল্লাহর ভয় না থাকা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি না নেওয়া। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'নিশ্চয়ই যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না ও পার্থিব জীবনেই সন্তুষ্ট আর এতেই পরিতৃপ্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলি সম্পর্কে গাফিল। এদেরই আবাস দোজখ, এদের কৃতকর্মের জন্যে।' (সুরা ইউনুস : ৭-৮)।

























