শহীদ ওয়াসিমের সাহসী ডাক ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি

- আপডেট সময় : ০১:৩৬:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল ষোলোশহর রেলস্টেশনে। আগের দিন রাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী, আমাদের মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নেতাকর্মীদের বেলা পৌনে ২টার মধ্যে ষোলোশহর আসার আহ্বান জানানো হয়। যাত্রা পথে ওয়াসিম আকরাম আমাকে ফোন করে সতর্ক করে জানায় যে, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি ও তার লোকজন অস্ত্রসহ ষোলোশহরে অবস্থান নিয়েছে, তাই সেখানে যাওয়া নিরাপদ হবে না। ওয়াসিম তখন কলেজ ছাত্রদলের বড় ভাই ও মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সালাউদ্দিন শাহেদের সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের দিকে ছিল।
আমি বিচ্ছিন্নভাবে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে বেলা ২টা ১৫ মিনিটের দিকে মুরাদপুর মোড়ে অবস্থান নিই। সেখানে ২ নম্বর গেট ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কাছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। ছোট ভাইদের মনোবল চাঙ্গা করতে আমি মিছিলের সিদ্ধান্ত নিই। আমি পায়ের অপারেশন নিয়ে মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এর ঠিক ১০ মিনিট পর চবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজান ওয়াসিমের আসার কথা জানালে আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। ওয়াসিম আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। তবে সে আবার বলল, ‘ভাই, দুটা ছোট ভাই আসছে, ওদের নিয়ে আসি। আপনি মিছিল শুরু করার আগেই চলে আসব।’ ওয়াসিমের কথা ভেবে আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। কিন্তু দেরি হওয়ায় মিছিল শুরুর প্রস্তুতি নিলে ছোট ভাইরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে বাধা দেয়। তবে মিলন ও আসিফের মতো নেতাকর্মীদের আস্থায় আমি মুরাদপুর ব্রিজে স্লোগান শুরু করি। মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ ছাত্ররা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।
ছাত্রলীগ দুদিক থেকে হামলা চালালে আমরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। একদিকে শিক্ষা বোর্ডের দিকে এবং অন্যদিকে মুরাদপুর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সামনে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হটিয়ে দেওয়া হয়। বিকাল ২টা ৫০ মিনিটের দিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম আমাকে ফোন করে পরিস্থিতি জানতে চান এবং তারেক রহমানের নির্দেশে রাজপথ ছাড়তে নিষেধ করেন। আমি সেই বার্তা নেতাকর্মীদের পৌঁছে দিই।
মুরাদপুর মোড় আমাদের নিয়ন্ত্রণে এলেও মির্জাপুল ও মসজিদ গলির দিক থেকে ছাত্রলীগ বারবার হামলা চালায়। প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিছুক্ষণ পরেই আমার মোবাইলে ১৫ থেকে ২০টি ফোন আসতে শুরু করে। সবাই জিজ্ঞেস করছিল, ‘ওয়াসিমের খবর কী, আপনি কিছু জানেন কি না?’ আমি বললাম, ‘আমি একদিকে আছি, আর ওয়াসিমরা শিক্ষা বোর্ডের সামনে প্রতিরোধমূলক অবস্থানে রয়েছে। আমিও মুরাদপুর-মির্জাপুলের ওইদিকে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করে মুরাদপুর ক্লিয়ার করে সেদিকেই যাচ্ছি।’ এর মধ্যেই খবর আসে শিক্ষা বোর্ডের সামনে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীদের গুলিতে ওয়াসিম গুরুতর আহত হয়েছে। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে জানতে পারি, ওয়াসিম ইমার্জেন্সিতে মৃত অবস্থায় আছে। আমি নিজে গিয়ে লাশঘরে ওয়াসিমের নিথর দেহ শনাক্ত করি। আমার ছোট ভাইয়ের মতো ওয়াসিমের এই আত্মত্যাগ জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।


























