তরুণদের উগ্রবাদে ঝুঁকে পড়ার নেপথ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও পরিচয়সংকট
- আপডেট সময় : ১২:০৪:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের উগ্রবাদ ও সহিংস চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি গবেষকদের দীর্ঘদিনের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শহুরে তরুণদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং গভীর পরিচয়সংকট তরুণদের মনোজগতে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা তাদের উগ্র মতাদর্শের দিকে ধাবিত করে।
উগ্রবাদের এই প্রক্রিয়ায় বিচ্ছিন্নতা মূলত দুইভাবে কাজ করে থাকে। প্রথমত, হতাশা, বঞ্চনা কিংবা মানসিক সংকটের কারণে অনেক তরুণ নিজে থেকেই পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে। এই তীব্র সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তাদের অনলাইন ও অফলাইনে উগ্রপন্থী প্রচারকদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত করে। দ্বিতীয়ত, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সুপরিকল্পিতভাবে কোনো ব্যক্তিকে তার সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। প্রথমে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে এবং পরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে তাদের মগজধোলাই বা ব্রেনওয়াশ করা সহজ হয়। এই প্রক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখে আত্মপরিচয়ের সংকট। সাম্প্রতিক সময়ে ‘বাঙালিত্ব’ ও ‘মুসলমানিত্ব’ পরিচয়কেন্দ্রিক টানাপোড়েন অনেক তরুণের মনে এক জটিল ও অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারা প্রায়ই দ্বিধায় ভোগেন যে তারা আগে বাঙালি নাকি মুসলমান, অথবা তারা বাঙালি মুসলমান নাকি বাংলাদেশি মুসলমান। এই সাংস্কৃতিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব তাদের একটি বৈশ্বিক ও একরূপী বা হোমোজেনাস ইসলামের ধারণার দিকে আকৃষ্ট করে, যা তাদের বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে একাত্মতাবোধের অনুভূতি দেয়।
অতীতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত এক ব্যক্তির স্বীকারোক্তিতেও এই পরিচয়সংকটের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি দীর্ঘদিনের দ্বিধা কাটিয়ে নিজেকে সর্বাগ্রে একজন ‘প্রকৃত মুসলমান’ হিসেবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং এরপরই তাঁর জীবনধারা উগ্রপন্থার দিকে মোড় নেয়। এছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানদের ওপর চলমান নিপীড়ন ও সংঘাতের খবর শহুরে তরুণদের মনে গভীর সহমর্মিতা ও একাত্মতাবোধ তৈরি করে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এই সংবেদনশীল অনুভূতিকে পুঁজি করে তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করে এবং তরুণদের মনে বিশ্বাস জন্মায় যে কেবল চিন্তাধারা লালন করাই যথেষ্ট নয়, বরং তা বাস্তবায়নে উগ্র পথ বেছে নেওয়া প্রয়োজন।
এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। সমাজে উগ্রবাদের উপস্থিতিকে অস্বীকার করার একটি প্রবণতা সরকারের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তবে এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে একে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিহত করার প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী মনে করেন, উগ্রবাদে তরুণদের উৎসাহিত হওয়ার মূল কারণগুলো পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে উগ্রবাদ দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।





























