ধ্বংসস্তূপের মাঝেও টিকে আছে গাজার মানুষের জীবন ও স্বপ্ন
- আপডেট সময় : ০৩:৩৫:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

২০১২ সালে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল যে, ২০২০ সালের মধ্যে গাজা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে। সেই সময় পানি, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল ও ঘরবাড়ির মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে একটি শহরের বাসযোগ্যতা কেবল এই অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; বরং মানুষের হাসি, শিশুদের খেলাধুলা, গান, ফুটবল মাঠ, বইয়ের পাতা, বিয়ের অনুষ্ঠান এবং সমুদ্রের পাড়ে কাটানো মুহূর্তগুলোই একটি শহরকে প্রাণবন্ত করে রাখে।
চলমান যুদ্ধ গাজার সেই জীবন্ত সত্তাকেই ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। কেবল মানুষের প্রাণহানি নয়, যুদ্ধ কেড়ে নিচ্ছে তাদের সম্ভাবনা ও স্মৃতি। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে মোহাম্মদ আল-ওয়াহিদি নামের এক ব্যক্তি নিহত হন, যিনি গাজায় মানুষের জন্য বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার আয়োজন করতেন। ফুটবলের মাধ্যমে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা এই ব্যক্তি মিসর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ দেখতে যাওয়ার পথে প্রাণ হারান। একই সময়ে ফুটবল দেখে বাড়ি ফেরার পথে আট ও দশ বছর বয়সী দুই ভাই ফারি ও হামজা আল-দেরিও নিহত হয়।
ফিলিস্তিনি অলিম্পিক কমিটির ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় এক হাজারের বেশি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন এবং ২৬৫টি ক্রীড়া স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এই মাঠগুলো ছিল তরুণদের জন্য যুদ্ধের কয়েক ঘণ্টার বিরতি পাওয়ার জায়গা। শুধু ক্রীড়াজগত নয়, শিল্প ও সাহিত্য জগতেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ সামি কারিকা, হেবা জাকুত, আমনা আল-সালমি, চলচ্চিত্র নির্মাতা ইসমাইল আবু হাতাবসহ অসংখ্য শিল্পী ও কবি নিহত হয়েছেন। কবি রেফাত আল-আরির, হিবা আবু নাদা, নূর হাজ্জাজ, ইনাস আল-সাকা ও রাশাদ আবু সাখিলার মতো সৃজনশীল মানুষ হারিয়েছেন প্রাণ।
যুদ্ধ কেবল মানুষকে হত্যা করে না, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনাকেও মুছে ফেলতে চায়। স্কুল ধ্বংসের মানে কেবল ভবন হারানো নয়, বরং একটি ব্ল্যাকবোর্ড, বেঞ্চ, লাইব্রেরি ও শিশুর প্রশ্নের উত্তর হারিয়ে ফেলা। গাজার কেন্দ্রীয় আর্কাইভ, গাজা মিউনিসিপ্যাল পাবলিক লাইব্রেরি এবং আল-ওমারি মসজিদের গ্রন্থাগারের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও রক্ষা পায়নি। আল-কারারা জাদুঘরের তিন হাজার প্রত্নবস্তু, যার অনেকগুলো কানানীয় যুগের ইতিহাসের সাক্ষী, এবং আটশ বছরের পুরোনো পাশা প্রাসাদসহ রাশাদ আল-শাওয়া সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। গাজার মানুষেরা জানে, একটি জাতির ঘর ভেঙে দিয়ে তাদের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা সহজ, কিন্তু মানুষের স্মৃতি কোনো ভবনের চারদেয়ালে বন্দী থাকে না।


























