পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের নকশা
- আপডেট সময় : ১০:০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষের ভেতর। পাঠ্যপুস্তক হলো শ্রেণিকক্ষের সেই নীরব অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষক। যদি পাঠ্যপুস্তক শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, তবে তা একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গঠনে ভূমিকা রাখে। এর বিপরীতে, পাঠ্যপুস্তকে যদি বৈষম্য, সংকীর্ণতা কিংবা অযৌক্তিক সামাজিক ধারণা প্রতিফলিত হয়, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজকে দীর্ঘকাল বহন করতে হয়।
শিশুর কাছে পাঠ্যপুস্তকে লেখা তথ্যই অনেক সময় চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গণ্য হয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শৈশবেই শিশুর আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যবস্তু, শিক্ষক এবং পরিবার—শিশুর আত্মবিশ্বাস গঠনে এই তিনটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাই পাঠ্যপুস্তক কেবল তথ্যের উৎস নয়, বরং এটি একটি মানসিক ও সামাজিক নির্মাণের উপকরণ।
আমাদের সমাজে রান্না, গৃহপরিচর্যা কিংবা পারিবারিক দায়িত্বকে নারীর একক কাজ হিসেবে দেখার প্রবণতা থাকলেও উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় এগুলোকে লাইফ স্কিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষা যদি সমাজকে পরিবর্তন করতে না পারে, তবে তা কেবল পরীক্ষার খাতা পূরণের জন্যই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
পাঠ্যবইয়ের চেয়ে আমাদের প্রধান সংকট এর প্রণয়ন পদ্ধতিতে। প্রায়ই দেখা যায়, বই ছাপানোর পর কারিকুলাম পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত, বই লেখার আগে কি পর্যাপ্ত গবেষণা হয়েছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামতের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা গবেষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা পৌঁছায় না। ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে তৈরি কারিকুলাম প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্যালয়ের বাস্তবতার সঙ্গে অনেক সময় খাপ খায় না। মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক কোনো অফিসকক্ষে নয়, বরং শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষণার সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় তৈরি হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন প্রক্রিয়া নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। প্রতিটি শ্রেণির জন্য বই তৈরির সময় শহর ও গ্রামের অন্তত দুটি করে মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, ভাষাবিজ্ঞানী ও কারিকুলাম গবেষকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। খসড়া পাঠ্যক্রম গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত করে শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ নাগরিকদের মতামত নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
নতুন কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক প্রথমে অন্তত এক বছরের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। এ জন্য জাতীয় অনলাইন কারিকুলাম ফিডব্যাক প্ল্যাটফর্ম চালু করে শিক্ষকদের মতামত ও সমস্যার প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব। সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলো কারিকুলাম প্রণয়নের সময় দীর্ঘ গবেষণা, পাইলটিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ব্যাপক জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শেখার আছে যে, শিক্ষাব্যবস্থার স্থায়িত্ব আসে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে, ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ থেকে নয়।
সরকার বা রাজনৈতিক দর্শন পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু পাঠ্যপুস্তককে প্রতি কয়েক বছর পরপর নতুন আদর্শের পরীক্ষাগারে পরিণত করা উচিত নয়। শিক্ষার্থীর প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান এবং নিরপেক্ষ ইতিহাস। শিক্ষা কোনো মন্ত্রণালয়ের একক সম্পদ নয়; শিক্ষা একটি জাতির সম্মিলিত বিবেক। আর সেই বিবেকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হওয়া উচিত আমাদের পাঠ্যপুস্তক।
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৫৫আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৫৬





























