ঢাকা ১২:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়াল বাজুস দেশের বাজারে ফের বাড়ল সোনার দাম, ভরি ২ লাখ ৩১ হাজার পার আখাউড়ায় ফলের বাজারে চড়া দাম, পুষ্টির চাহিদা মেটাতে হিমশিম ক্রেতারা চোট থেকে ফিরেই নেইমারের জোড়া গোল, হার এড়ালো সান্তোস বগুড়ার বেশ কিছু এলাকায় শনিবার ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে দুই বাসের সংঘর্ষ, দরজা ভেঙে যাত্রী উদ্ধার ডিসির মতবিনিময় সভায় এমপির প্রতিনিধি হয়ে বক্তব্য দিলেন অস্ত্র মামলার আসামি দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মালয়েশিয়ায় স্কুল বন্ধ হাসপাতালে ভর্তি জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমান ঢাকায় ডিএমপির বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার ৪৮০

শিক্ষক শুধু চাকরিজীবী নন, মানুষ গড়ার কারিগরও

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৩:০৮:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



একটি বিদ্যালয়ের প্রকৃত সম্পদ তার বহুতল ভবন বা আধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং একজন যোগ্য, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। শিক্ষকদের সঠিক পথে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন একজন দূরদর্শী ও নীতিবান প্রধান শিক্ষক। অর্থ ব্যয় করে অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হলেও, একজন আদর্শবান শিক্ষক তৈরি করা কেবল সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং গভীর দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি দিয়েই সম্ভব। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেধাবী শিশুর জন্ম হলেও, তাদের পরিচর্যা ও স্বপ্নের দিশা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব।

আমার জীবনে এমন এক কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুন নূর চৌধুরী। তাঁর কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তাঁর অসামান্য সততা, শৃঙ্খলাবোধ ও শিক্ষকতার দক্ষতার কথা প্রাক্তন ছাত্রদের মুখে কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে ছিল। পদ বা ক্ষমতার চেয়েও তিনি তাঁর কর্ম ও ভালোবাসার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। গণিত শিক্ষাদানে তাঁর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সহজ ও কার্যকর, যার ফলে শ্রেণিকক্ষই ছিল আমাদের শেখার মূল কেন্দ্র এবং আলাদা কোচিংয়ের প্রয়োজন হতো না।

আজকের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের ওপর শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত নির্ভরতা দেখে সেই সময়ের কথা মনে পড়ে। আমরা কি সত্যিই শিক্ষাকে আধুনিক করেছি, নাকি কার্যকর শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছি? অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আবদুন নূর চৌধুরী স্যার বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আমাদের নিয়ে বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করেছিলেন। সেই অতিরিক্ত শ্রমের জন্য শিক্ষকেরা কোনো পারিশ্রমিক বা কোচিং ফি নিতেন না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ছাত্রের সাফল্য ও বিদ্যালয়ের সুনাম। বৃত্তি পাওয়ার পর মিষ্টিমুখ করানোর প্রস্তাব দিলে স্যার বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যা আজও আমাকে নৈতিকতার এক বড় শিক্ষা হিসেবে অনুপ্রাণিত করে।

এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতেন। মেধাবী ও দুর্বল ছাত্রদের জন্য তাঁর বিশেষ মনোযোগ ছিল। তিনি প্রাক্তন ছাত্রদেরও বিদ্যালয়ের কাজে সম্পৃক্ত করতেন, যারা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই ছোট ভাইদের সহায়তা করত। বিদ্যালয়ের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্কাউটিংকে তিনি পড়াশোনার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন না, বরং পরিপূর্ণ মানুষ গড়ার অংশ হিসেবে দেখতেন। সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে তিনি বিদ্যালয় পরিচালনা করতেন।

আজ যখন আমরা উন্নত বিশ্বের শিক্ষা-মডেল নিয়ে কাজ করছি, তখন আমাদের অতীতের সফল শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা-সংস্কারের পাঠগুলো স্মরণে রাখা প্রয়োজন। আবদুন নূর চৌধুরীদের মতো প্রধান শিক্ষকেরা যেভাবে একটি বিদ্যালয়কে প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন, সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি যোগ্য শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে পারে এবং তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই গ্রামের স্কুলগুলো আবার প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র হয়ে উঠবে। তিনি আমাদের শুধু গণিত শেখাননি, শিখিয়েছিলেন মানুষ হওয়ার অঙ্ক।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

নিউজটি শেয়ার করুন

শিক্ষক শুধু চাকরিজীবী নন, মানুষ গড়ার কারিগরও

আপডেট সময় : ০৩:০৮:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

একটি বিদ্যালয়ের প্রকৃত সম্পদ তার বহুতল ভবন বা আধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং একজন যোগ্য, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। শিক্ষকদের সঠিক পথে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন একজন দূরদর্শী ও নীতিবান প্রধান শিক্ষক। অর্থ ব্যয় করে অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হলেও, একজন আদর্শবান শিক্ষক তৈরি করা কেবল সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং গভীর দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি দিয়েই সম্ভব। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেধাবী শিশুর জন্ম হলেও, তাদের পরিচর্যা ও স্বপ্নের দিশা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব।

আমার জীবনে এমন এক কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুন নূর চৌধুরী। তাঁর কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তাঁর অসামান্য সততা, শৃঙ্খলাবোধ ও শিক্ষকতার দক্ষতার কথা প্রাক্তন ছাত্রদের মুখে কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে ছিল। পদ বা ক্ষমতার চেয়েও তিনি তাঁর কর্ম ও ভালোবাসার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। গণিত শিক্ষাদানে তাঁর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সহজ ও কার্যকর, যার ফলে শ্রেণিকক্ষই ছিল আমাদের শেখার মূল কেন্দ্র এবং আলাদা কোচিংয়ের প্রয়োজন হতো না।

আজকের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের ওপর শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত নির্ভরতা দেখে সেই সময়ের কথা মনে পড়ে। আমরা কি সত্যিই শিক্ষাকে আধুনিক করেছি, নাকি কার্যকর শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছি? অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আবদুন নূর চৌধুরী স্যার বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আমাদের নিয়ে বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করেছিলেন। সেই অতিরিক্ত শ্রমের জন্য শিক্ষকেরা কোনো পারিশ্রমিক বা কোচিং ফি নিতেন না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ছাত্রের সাফল্য ও বিদ্যালয়ের সুনাম। বৃত্তি পাওয়ার পর মিষ্টিমুখ করানোর প্রস্তাব দিলে স্যার বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যা আজও আমাকে নৈতিকতার এক বড় শিক্ষা হিসেবে অনুপ্রাণিত করে।

এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতেন। মেধাবী ও দুর্বল ছাত্রদের জন্য তাঁর বিশেষ মনোযোগ ছিল। তিনি প্রাক্তন ছাত্রদেরও বিদ্যালয়ের কাজে সম্পৃক্ত করতেন, যারা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই ছোট ভাইদের সহায়তা করত। বিদ্যালয়ের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্কাউটিংকে তিনি পড়াশোনার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন না, বরং পরিপূর্ণ মানুষ গড়ার অংশ হিসেবে দেখতেন। সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে তিনি বিদ্যালয় পরিচালনা করতেন।

আজ যখন আমরা উন্নত বিশ্বের শিক্ষা-মডেল নিয়ে কাজ করছি, তখন আমাদের অতীতের সফল শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা-সংস্কারের পাঠগুলো স্মরণে রাখা প্রয়োজন। আবদুন নূর চৌধুরীদের মতো প্রধান শিক্ষকেরা যেভাবে একটি বিদ্যালয়কে প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন, সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি যোগ্য শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে পারে এবং তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই গ্রামের স্কুলগুলো আবার প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র হয়ে উঠবে। তিনি আমাদের শুধু গণিত শেখাননি, শিখিয়েছিলেন মানুষ হওয়ার অঙ্ক।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh