ঢাকা ০৭:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাল ইরান পাকিস্তানে আফগান শিক্ষার্থীদের মেডিকেল ও ডেন্টাল পড়াশোনা স্থগিতের নির্দেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তায় রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সমন্বিত কার্যক্রম কেমব্রিজের সাবেক অধ্যাপক জ্যাসন আরডেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার সরকারি চাকরির নামে প্রতারণা, উপসচিবের স্বাক্ষর জালকারী গ্রেপ্তার ১৫ আগস্ট ঘিরে ঢাকায় কড়া নিরাপত্তা, মাঠে সোয়াট ও কে-নাইন বেতন নয়, কর্মপরিবেশ ও নমনীয়তাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মের কর্মীরা বেলজিয়ামে বাড়ি সংস্কারের সময় দেয়াল থেকে মিলল ১১৭ কোটি টাকার স্বর্ণ একাদশে ভর্তি নিয়ে জরুরি নির্দেশনা দিল সেন্ট যোসেফ কলেজ সংস্কার ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা আসিফ মাহমুদের

১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও মুজিব হত্যাকাণ্ড: মার্কিন নথির বিশ্লেষণ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:০১:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনা এবং সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের নানা উপাদান মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথিতে পাওয়া যায়। প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান এই নথিগুলো বিশ্লেষণ করে ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য সেই লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো। বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে অন্তত সাতটি তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন। ১৬ আগস্ট পাঠানো প্রাথমিক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, ১৫ আগস্ট স্থানীয় সময় ভোর সোয়া পাঁচটায় অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল এবং ২৪ ঘণ্টা পরের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল এটিকে কেউ চ্যালেঞ্জ করবে না।

ওয়াশিংটনে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ঢাকার পরিস্থিতি জানতে অত্যন্ত উদ্‌গ্রীব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার ১১-১২ ঘণ্টা পর তিনি তাঁর স্টাফ বৈঠকে উল্লেখ করেন যে, তিনি আইএনআর (ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ) থেকে এ বিষয়ে ভালো তথ্য পেয়েছেন। এ সময় ব্যুরোর পরিচালক উইলিয়াম জি হিল্যান্ড জানান, আলোচনার সময়ও মুজিব জীবিত ছিলেন। সিআইএর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা হিল্যান্ড গত বছরের ২৫ মার্চ ৭৯ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর কিসিঞ্জার তাঁকে একজন ভালো বিশ্লেষক ও দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ১৫ আগস্ট ওয়াশিংটন সময় সকাল আটটার আগে কিসিঞ্জার ও হিল্যান্ডের কথোপকথনের বিস্তারিত জানা যায়নি।

তবে ১৫ আগস্ট কিসিঞ্জার যখন তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে শুনলেন যে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ছিল সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত, তখন তিনি তাৎক্ষণিক প্রশ্ন করেন, মুজিব জীবিত না মৃত? নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলফ্রেড আথারটন তখন জানান, মুজিব নিহত হয়েছেন এবং তাঁর নিকটতম আত্মীয়স্বজনদের অধিকাংশই বেঁচে নেই। দলিল থেকে জানা যায়, হার্ভার্ড স্নাতকোত্তর ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আথারটন এবং ১৯৬৯ পর্যন্ত সিআইএতে থাকা হিল্যান্ড এই অভ্যুত্থানের খুঁটিনাটি জানতেন। আথারটন ২০০২ সালের ৩০ অক্টোবর মারা যান এবং হিল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন।

হিল্যান্ডের মুখে ‘মুজিব তখনো মারা যাননি’ শুনে কিসিঞ্জার পাল্টা প্রশ্ন করেন, তারা কি মুজিবকে কিছু সময় পরে হত্যা করেছিল? আথারটন এর জবাবে বলেন, বিস্তারিত সবকিছু জানা না গেলেও ইঙ্গিত ছিল তাঁকে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়েই। তারা তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলে, ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাঁকে হত্যা করে। রাষ্ট্রদূত বোস্টার তাঁর তারবার্তায় ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংবেদনশীল ও সতর্ক ছিলেন। ১৬ আগস্ট তিনি লেখেন, জনসাধারণ মুজিবের পতনে আনন্দ প্রকাশ না করলেও একটি শান্ত ও গ্রহণসূচক অবস্থা বজায় রয়েছে।

বোস্টারের মতে, বাঙালিদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং দৃশ্যত ব্যক্তিগত ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার কারণে শেখ মুজিব ও বাঙালিরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি মুজিবের মধ্যে স্বৈরশাসকের চিরায়ত বৈকল্য ফুটে উঠছিল। বোস্টারের কথায়, জুনের গোড়া থেকে শেখ মুজিব ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর ভাগনে শেখ মনির ক্রমবর্ধমান প্রভাব অভ্যুত্থানকারীদের সন্দেহমুক্ত করে যে পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব করা আর সমীচীন হবে না। ভারতীয় স্বাধীনতা দিবস বেছে নেওয়ার বিষয়টি কাকতালীয় হলেও তা লক্ষণীয় ছিল।

খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার সম্পর্কে বোস্টার জানান, তারা সামান্যই উৎসাহ সৃষ্টি করতে পেরেছে। তবে মন্ত্রিসভায় পরিচিত মুখগুলো রয়ে যাওয়ায় মনে হয় মোশতাক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলবেন। মোশতাক তাঁর প্রথম বেতার ভাষণে পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ইঙ্গিত দেন। পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং ভারতের সঙ্গে সদ্ভাব না থাকলেও বাড়তি সন্দেহ সৃষ্টি না করার বার্তাই নতুন সরকার দিতে চেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে সরকার সোভিয়েত প্রভাব স্তিমিত করতে চেয়েছিল।

বোস্টার আরও লেখেন, নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক মুজিব সরকারের চেয়ে আরও অন্তরঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ মুজিব সরকারের আমেরিকাবিরোধী পরিচিত মুখ শেখ মনি ও আবদুস সামাদ আজাদ আর নেই। নতুন রাষ্ট্রপতি অতীতে প্রকাশ্যে প্রো-আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছিলেন। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মোশতাক সরকারের সম্পর্ক নিয়ে বোস্টার সরাসরি মন্তব্য না করলেও জানান, সরকারি বিবৃতিতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লিখিত হচ্ছে। তিনি ধারণা করেন, মোশতাক সরকার হয়তো গত জানুয়ারিতে মুজিবের চাপিয়ে দেওয়া সংবিধানের চেয়ে অধিকতর উদার সংবিধান দেবে। সবশেষে বোস্টার উল্লেখ করেন, মুজিবের মতো কোনো কমান্ডিং ব্যক্তিত্ব না থাকায় এবং বেসামরিক সরকারের পদস্খলন ঘটায় জাতিকে বাঁচাতে সামরিক বাহিনীর দিকেই এখন তাকিয়ে থাকতে হবে।

এ সময় ব্যুরোর পরিচালক উইলিয়াম জি হিল্যান্ড বলেন, ‘আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলি, মুজিব তখনো মারা যাননি।’ সিআইএর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা হিল্যান্ড ৭৯ বছর বয়সে গত বছরের ২৫ মার্চ মারা যান। ‘তিনি ছিলেন এক ভালো বিশ্লেষক। আমাদের গ্রুপে তিনি ছিলেন অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তাঁর মৃত্যুর পর এ মন্তব্য করেন কিসিঞ্জার (ওয়াশিংটন পোস্ট, ২৮ মার্চ ২০০৮)। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ওয়াশিংটন সময় সকাল আটটার আগে মুজিবের মৃত্যুর বিষয়ে কিসিঞ্জার-হিল্যান্ড কথোপকথনের বিস্তারিত জানা যায়নি।

১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি মিসরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ হিল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে খ্যাতি কুড়ান। তিনি ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও মুজিব হত্যাকাণ্ড: মার্কিন নথির বিশ্লেষণ

আপডেট সময় : ০৫:০১:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনা এবং সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের নানা উপাদান মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথিতে পাওয়া যায়। প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান এই নথিগুলো বিশ্লেষণ করে ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য সেই লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো। বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে অন্তত সাতটি তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন। ১৬ আগস্ট পাঠানো প্রাথমিক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, ১৫ আগস্ট স্থানীয় সময় ভোর সোয়া পাঁচটায় অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল এবং ২৪ ঘণ্টা পরের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল এটিকে কেউ চ্যালেঞ্জ করবে না।

ওয়াশিংটনে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ঢাকার পরিস্থিতি জানতে অত্যন্ত উদ্‌গ্রীব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার ১১-১২ ঘণ্টা পর তিনি তাঁর স্টাফ বৈঠকে উল্লেখ করেন যে, তিনি আইএনআর (ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ) থেকে এ বিষয়ে ভালো তথ্য পেয়েছেন। এ সময় ব্যুরোর পরিচালক উইলিয়াম জি হিল্যান্ড জানান, আলোচনার সময়ও মুজিব জীবিত ছিলেন। সিআইএর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা হিল্যান্ড গত বছরের ২৫ মার্চ ৭৯ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর কিসিঞ্জার তাঁকে একজন ভালো বিশ্লেষক ও দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ১৫ আগস্ট ওয়াশিংটন সময় সকাল আটটার আগে কিসিঞ্জার ও হিল্যান্ডের কথোপকথনের বিস্তারিত জানা যায়নি।

তবে ১৫ আগস্ট কিসিঞ্জার যখন তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে শুনলেন যে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ছিল সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত, তখন তিনি তাৎক্ষণিক প্রশ্ন করেন, মুজিব জীবিত না মৃত? নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলফ্রেড আথারটন তখন জানান, মুজিব নিহত হয়েছেন এবং তাঁর নিকটতম আত্মীয়স্বজনদের অধিকাংশই বেঁচে নেই। দলিল থেকে জানা যায়, হার্ভার্ড স্নাতকোত্তর ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আথারটন এবং ১৯৬৯ পর্যন্ত সিআইএতে থাকা হিল্যান্ড এই অভ্যুত্থানের খুঁটিনাটি জানতেন। আথারটন ২০০২ সালের ৩০ অক্টোবর মারা যান এবং হিল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন।

হিল্যান্ডের মুখে ‘মুজিব তখনো মারা যাননি’ শুনে কিসিঞ্জার পাল্টা প্রশ্ন করেন, তারা কি মুজিবকে কিছু সময় পরে হত্যা করেছিল? আথারটন এর জবাবে বলেন, বিস্তারিত সবকিছু জানা না গেলেও ইঙ্গিত ছিল তাঁকে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়েই। তারা তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলে, ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাঁকে হত্যা করে। রাষ্ট্রদূত বোস্টার তাঁর তারবার্তায় ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংবেদনশীল ও সতর্ক ছিলেন। ১৬ আগস্ট তিনি লেখেন, জনসাধারণ মুজিবের পতনে আনন্দ প্রকাশ না করলেও একটি শান্ত ও গ্রহণসূচক অবস্থা বজায় রয়েছে।

বোস্টারের মতে, বাঙালিদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং দৃশ্যত ব্যক্তিগত ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার কারণে শেখ মুজিব ও বাঙালিরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি মুজিবের মধ্যে স্বৈরশাসকের চিরায়ত বৈকল্য ফুটে উঠছিল। বোস্টারের কথায়, জুনের গোড়া থেকে শেখ মুজিব ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর ভাগনে শেখ মনির ক্রমবর্ধমান প্রভাব অভ্যুত্থানকারীদের সন্দেহমুক্ত করে যে পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব করা আর সমীচীন হবে না। ভারতীয় স্বাধীনতা দিবস বেছে নেওয়ার বিষয়টি কাকতালীয় হলেও তা লক্ষণীয় ছিল।

খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার সম্পর্কে বোস্টার জানান, তারা সামান্যই উৎসাহ সৃষ্টি করতে পেরেছে। তবে মন্ত্রিসভায় পরিচিত মুখগুলো রয়ে যাওয়ায় মনে হয় মোশতাক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলবেন। মোশতাক তাঁর প্রথম বেতার ভাষণে পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ইঙ্গিত দেন। পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং ভারতের সঙ্গে সদ্ভাব না থাকলেও বাড়তি সন্দেহ সৃষ্টি না করার বার্তাই নতুন সরকার দিতে চেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে সরকার সোভিয়েত প্রভাব স্তিমিত করতে চেয়েছিল।

বোস্টার আরও লেখেন, নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক মুজিব সরকারের চেয়ে আরও অন্তরঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ মুজিব সরকারের আমেরিকাবিরোধী পরিচিত মুখ শেখ মনি ও আবদুস সামাদ আজাদ আর নেই। নতুন রাষ্ট্রপতি অতীতে প্রকাশ্যে প্রো-আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছিলেন। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মোশতাক সরকারের সম্পর্ক নিয়ে বোস্টার সরাসরি মন্তব্য না করলেও জানান, সরকারি বিবৃতিতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লিখিত হচ্ছে। তিনি ধারণা করেন, মোশতাক সরকার হয়তো গত জানুয়ারিতে মুজিবের চাপিয়ে দেওয়া সংবিধানের চেয়ে অধিকতর উদার সংবিধান দেবে। সবশেষে বোস্টার উল্লেখ করেন, মুজিবের মতো কোনো কমান্ডিং ব্যক্তিত্ব না থাকায় এবং বেসামরিক সরকারের পদস্খলন ঘটায় জাতিকে বাঁচাতে সামরিক বাহিনীর দিকেই এখন তাকিয়ে থাকতে হবে।

এ সময় ব্যুরোর পরিচালক উইলিয়াম জি হিল্যান্ড বলেন, ‘আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলি, মুজিব তখনো মারা যাননি।’ সিআইএর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা হিল্যান্ড ৭৯ বছর বয়সে গত বছরের ২৫ মার্চ মারা যান। ‘তিনি ছিলেন এক ভালো বিশ্লেষক। আমাদের গ্রুপে তিনি ছিলেন অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তাঁর মৃত্যুর পর এ মন্তব্য করেন কিসিঞ্জার (ওয়াশিংটন পোস্ট, ২৮ মার্চ ২০০৮)। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ওয়াশিংটন সময় সকাল আটটার আগে মুজিবের মৃত্যুর বিষয়ে কিসিঞ্জার-হিল্যান্ড কথোপকথনের বিস্তারিত জানা যায়নি।

১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি মিসরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ হিল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে খ্যাতি কুড়ান। তিনি ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo