একা বিদেশযাত্রায় নারীদের ইমিগ্রেশন হয়রানি ও হাইকোর্টের রুল
- আপডেট সময় : ০৪:৪৫:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

একজন নারী একা বিদেশে যাচ্ছেন। তাঁর হাতে রয়েছে বৈধ পাসপোর্ট, টিকিট ও প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র। তবুও বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে তাঁকে শুনতে হচ্ছে—কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, স্বামী জানেন কি না, কিংবা অভিভাবক সঙ্গে নেই কেন? অনেক সময় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা সরাসরি স্বামীর ফোন নম্বর নিয়ে কল করে বিদেশযাত্রার বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টাও করেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীও এমন দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের হাত থেকে রেহাই পান না।
সম্প্রতি নেপাল যাওয়ার পথে তিন অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ইমিগ্রেশন থেকে আটকে দেওয়ার ঘটনা এই পুরোনো সমস্যার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। ওই তিন নারী দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নওগাঁর বাসিন্দা। তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়ে রিট করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, কোনো আইনি কারণ বা লিখিত নোটিশ ছাড়াই তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই তিন নারীর বিদেশযাত্রায় কোনো আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা অন্য কোনো আইনগত প্রতিবন্ধকতা ছিল না।
এই রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দিয়েছেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, কেন ওই তিন নারীকে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রায় শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা অনুরূপ লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় বাধা না দিতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা–ও জানতে চেয়েছেন আদালত।
রিট আবেদনকারী তিন নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ আগস্ট সকাল ১০টা ৫ মিনিটের ফ্লাইটে তাঁদের নেপাল যাওয়ার কথা ছিল। সকাল ৯টায় বিমানবন্দরে পৌঁছালেও ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ তাঁদের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ বিষয়ে পুলিশের সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন হওয়ায় তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না। তবে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, নেপাল মানব পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় সেখানে অন অ্যারাইভাল ভিসার কারণে কাগজপত্র পরীক্ষায় কড়াকড়ি করা হয়। তাঁর দাবি, ওই নারীরা সেমিনারের আমন্ত্রণপত্র দেখাতে পারেননি।
একা বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন আরও অনেক নারী। জেন্ডার বিশ্লেষক সাবিনা পারভীন জানিয়েছেন, তাঁর পরিচিত ৫২ বছর বয়সী এক নারীকেও একবার ইমিগ্রেশন আটকে দিয়েছিল কারণ তিনি পরিবারের সদস্য ছিলেন না। অধিকারকর্মী ফেরদৌস আরা রুমীও জানিয়েছেন, কর্মশালায় যাওয়ার পথে তাঁকে স্বামীর বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এমনকি এই প্রতিবেদকের নিজের সাংবাদিকতা জীবনেও বিদেশযাত্রার সময় ইমিগ্রেশনে অনাকাঙ্ক্ষিত জিজ্ঞাসাবাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার এ ধরনের আচরণ সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সমতা, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ৩৬ অনুচ্ছেদের চলাফেরার স্বাধীনতার পরিপন্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হকের মতে, অপরাধের প্রমাণ ছাড়া শুধু সন্দেহের বশে প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে আটকে রাখা অযৌক্তিক। তিনি মনে করেন, কর্তৃপক্ষের উচিত ঠিক কোন প্রেক্ষাপটে এমন বাধা দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ করা।




























