ঢাকায় নতুন দুই মেট্রোরেল প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে দ্বিগুণের বেশি
- আপডেট সময় : ০২:৫২:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে যাওয়া নতুন দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। শুরুতে এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) নামের এই প্রকল্প দুটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বর্তমানে তা বাড়িয়ে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা করার নতুন প্রস্তাব তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। এই বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাবটি এখন পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এই বিশাল ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখতে গত ২৪ মে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছিল বর্তমান বিএনপি সরকার। সাত সদস্যের এই কমিটি গত জুলাইয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে ব্যয় দ্বিগুণ হওয়াকে যৌক্তিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারিগরি কমিটির এই সবুজ সংকেতের পরই ডিএমটিসিএল সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। আজ পরিকল্পনা কমিশনে এই বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব নিয়ে মূল্যায়ন বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্প দুটির একটি হলো কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পাতাল ও উড়ালপথের সমন্বয়ে নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-১। ২০১৯ সালে যখন এই প্রকল্প নেওয়া হয়, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায়। প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল প্রকল্প হতে যাচ্ছে। ৩১ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এই লাইনে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, সাভার থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই লাইনে প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াবে ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।
এই প্রকল্প দুটিতে অর্থায়ন করছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই প্রথম এই বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি সামনে আসে এবং তখন ব্যয় কমানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে জাইকার সঙ্গে এ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়। সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ঢাকাকে বাঁচাতে হলে মেট্রোরেল অপরিহার্য। তিনি জানান, পূর্ববর্তী সরকারের আমলেই প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ নকশা সম্পন্ন হয়েছিল। আগে পূর্ণাঙ্গ নকশা না হলে হয়তো কিছু খরচ কমানো যেত, তবে এখন কাজ না করলে ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়বে।
ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, ২০১৯ সালের মূল প্রাক্কলনের সময় বিস্তারিত নকশা ছিল না। পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন, বার্ষিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, নির্মাণসামগ্রী যেমন- সিমেন্ট, ইস্পাত, জ্বালানি ও বিটুমিনের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০১৯ সালে প্রতি ডলারের মূল্য ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরা হলেও ২০২৫ সালের হিসাবে তা ১২২ টাকা ধরা হয়েছে, যা প্রায় ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি। এছাড়া কর, ভ্যাট, জমি অধিগ্রহণ, পরিষেবা লাইন স্থানান্তর, পরামর্শক ব্যয় এবং নির্মাণকালীন সুদ ও আপৎকালীন খরচও যুক্ত হয়েছে। কারিগরি কমিটির প্রধান শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, সময় বাড়ার সাথে সাথে ব্যয় বাড়বে। ব্যয় বেশি মনে হলে সরকার অন্য ঋণদাতাও খুঁজতে পারে।
তবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাবকে এই আকাশচুম্বী ব্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, জাইকার শর্তের কারণে দরপত্রে কেবল জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেয় এবং তারা চড়া দাম হাঁকায়। দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে না পারলে ব্যয় কমানো সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, বর্তমানে চলমান উত্তরা-মতিঝিল (যা কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হচ্ছে) মেট্রোরেল প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। ২০১২ সালে নেওয়া এই পুরো প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অন্যদিকে, এশিয়ার অন্যান্য দেশে, যেমন ভারতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা, যেখানে তারা ঋণের শর্ত শিথিল রেখে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে পেরেছে।


























