বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় নতুন করে ভাবার আহ্বান গুতেরেসের
- আপডেট সময় : ০৬:১৯:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

বিশ্বের চলমান সংকটগুলোকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের শুরুতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুদ্ধ, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের মতো বিষয়গুলোর মূলে রয়েছে ক্ষমতার ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। গুতেরেস সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিশ্বের বিভাজনের রেখাগুলো ক্রমেই গভীর হচ্ছে এবং ছোট ছোট ফাটল এখন বিশাল খাদে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের সংকটগুলো মূলত ক্ষমতার পরিবর্তিত চিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।
মহাসচিব তার বক্তব্যে ক্ষমতার তিনটি বড় পরিবর্তনের দিক তুলে ধরেন। প্রথমত, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাবের নতুন নতুন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সরকারের হাত থেকে ক্ষমতার একটি বড় অংশ শক্তিশালী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির হাতে চলে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মানুষের কাছ থেকে যন্ত্রের কাছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে চলে যাচ্ছে। গুতেরেসের মতে, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন সময়ের স্বার্থকে ধারণ করছে, যে সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তাই প্রতিদ্বন্দ্বী জোটে বিভক্ত না হয়ে পারস্পরিক নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক আইন ও অভিন্ন নিয়মের ভিত্তিতে একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব গড়ার আহ্বান জানান তিনি।
বড় শক্তিগুলোর উদ্দেশে গুতেরেস বলেন, তাদের ক্ষমতা সর্বময় নয় এবং সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়ে আজকের জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি যুদ্ধ ও শান্তি, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যতের চারটি বড় পরীক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, সুদান ও মিয়ানমারের সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শক্তি কূটনীতিকে ছাড়িয়ে যায় এবং জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত যুদ্ধবিরতিও প্রকৃত শান্তি আনতে পারে না, বরং তা কেবল আগুন কিছুটা কমিয়ে দেয়, যার মূল্য সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত দিতে হয়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে গুতেরেস বলেন, একবিংশ শতকের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকা অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করা জরুরি। বৈষম্যকে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয় বরং ক্ষমতার প্রশ্ন হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, সম্পদ ও সুযোগের বণ্টনে এখনো কোটি কোটি মানুষ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। তবে নারীর সমতার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অর্জনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সংস্থার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব, সদর দপ্তরের কর্মী এবং পেশাদার পর্যায়ে পূর্ণ লিঙ্গসমতা অর্জিত হয়েছে। তার ভাষায়, সমতা কোনো স্বপ্ন নয়, এটি একটি সিদ্ধান্ত।
জলবায়ু সংকটকে তিনি প্রজন্মের সবচেয়ে গভীর ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা হিসেবে উল্লেখ করে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য অতিক্রমের আশঙ্কার কথা জানান। তিনি উন্নত দেশগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমে সহায়তা বাড়ানোর এবং জলবায়ু দূষণের জন্য দায়ীদের মূল্য পরিশোধের আহ্বান জানান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, তথ্য, কম্পিউটিং সক্ষমতা ও অ্যালগরিদমের ওপর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির তুলনায় তাকে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির আওতায় আনার সক্ষমতা বাড়ছে না।
মহাসচিব হিসেবে নিজের মেয়াদের শেষ ১০০ দিনের কথা উল্লেখ করে গুতেরেস বলেন, মর্যাদা, সুযোগ ও অধিকার থেকে শান্তিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকার—এই তিন ভিত্তিকে রক্ষা করাই তার লক্ষ্য। তিনি জানান, ‘ভবিষ্যতের জন্য চুক্তি’ এবং জাতিসংঘের ৮০তম বর্ষের উদ্যোগের মাধ্যমে সংস্থাটিকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও সমন্বিত করার চেষ্টা চলছে। তার শেষ বার্তা ছিল স্পষ্ট—ক্ষমতার প্রকৃত শক্তি অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করা যেখানে সবার জন্য জায়গা থাকবে। বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি হতে জাতিসংঘকে দুর্বল নয়, বরং আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


























