পাট জাগ ও বর্জ্যে বিপর্যস্ত নড়াইলের চিত্রা-নবগঙ্গা, বিলুপ্ত হচ্ছে দেশীয় মাছ
- আপডেট সময় : ০৮:০৪:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী চিত্রা ও নবগঙ্গা নদী এখন তীব্র দূষণের কবলে পড়ে মরণদশায় পৌঁছেছে। নদীতে ব্যাপক হারে পাট জাগ দেওয়া এবং শহরের ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সরাসরি নদীর সঙ্গে যুক্ত করার কারণে পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এক সময়ের স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জলরাশি এখন কালো বর্ণ ধারণ করেছে, আর পচা পানির দুর্গন্ধে নদী সংলগ্ন এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই দূষণের ফলে নদীর সুমিষ্ট পানির দেশীয় মাছের বিশাল ভাণ্ডার প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে এবং হুমকিতে পড়েছে সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীগুলোর বুক জুড়ে এখন আর জেলেদের নৌকা বা জাল ফেলে মাছ ধরার চিরচেনা দৃশ্য চোখে পড়ে না। তার বদলে নদীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দখল করে নিয়েছে কৃষকদের উৎপাদিত পাট পচানোর প্রক্রিয়া। পর্যাপ্ত পানির উৎস না থাকায় নিরুপায় হয়ে চাষিরা নদীতেই পাট জাগ দিচ্ছেন। অতীতে নড়াইলে বিল সংলগ্ন ডোবা, নালা, খাল, পুকুর ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকত এবং সেখানেই কৃষকেরা পাট জাগ দিতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেসব জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় চাষিরা চিত্রা ও নবগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদী ও খালে পাট জাগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
নদী দুটির এই সংকটের পেছনে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবও অন্যতম কারণ। উজানের পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় চিত্রা ও নবগঙ্গার গভীরতা অনেক কমে গেছে। ফলে নদীর পানি প্রবাহ কম থাকায় পচা পাটের প্রভাবে প্রতি বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর—এই চার মাস নদী দুটির পানি মারাত্মকভাবে দূষিত থাকে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে নদী থেকে বিলীন হয়ে গেছে গলদা ও কাঁঠালিসহ বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি, রিঠা, চেলেন্দা, চাপিলা, টাটকেনি, পদ্মবাউস, ভেটকি, বাতাসী, বাচা, সরপুঁটি, পাবদা, বোয়াল, আইড়, চিতল, রুই ও কাতলাসহ অসংখ্য সুস্বাদু দেশীয় মাছ।
কৃষকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নদীতে পাট জাগ দিলে মাছের ক্ষতি হয় তা তারা জানেন। কিন্তু বিল থেকে পাট নদীতে নিয়ে যেতে পরিবহন খরচ অনেক বেশি হলেও নদীর পানিতে পাট পচালে আঁশের মান ভালো হয়। এছাড়া এলাকায় বিকল্প কোনো বড় জলাশয় না থাকায় তারা নদীতেই পাট জাগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি শাহ আলম এ বিষয়ে বলেন, হারিয়ে যাওয়া বিল সংলগ্ন ডোবা-নালা ও পুকুরগুলো উদ্ধার এবং সংস্কার করে সেখানে পাট পচানোর ব্যবস্থা করা গেলে নদী দূষণ রোধ করা সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি চাষিদের পাট পচানোর আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করার ওপর জোর দেন।
নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. আব্দুল ছালাম পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি আমাদের অন্যতম অর্থকরী ফসল পাটের সুরক্ষাও জরুরি। কৃষকদের ফসল ঘরে তোলার প্রক্রিয়া সহজ ও বিড়ম্বনামুক্ত করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে চাষিদের নদীতে পাট জাগ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে এবং একটি কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।




























