তরুণদের সফট ও হার্ড স্কিল অর্জনের পরামর্শ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসমাইলের
- আপডেট সময় : ১২:৩৯:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

বর্তমান সময়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল চাকরির বাজারে শুধু একাডেমিক ডিগ্রি বা ভালো ফলাফলই ক্যারিয়ারে সফলতা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং যোগাযোগ, নেতৃত্ব ও সময় ব্যবস্থাপনার মতো সফট স্কিল অর্জন করা সমান জরুরি। তরুণদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন, ব্যর্থতা মোকাবিলা এবং কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার কৌশল নিয়ে সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মুহাম্মদ ইসমাইল (পিএইচডি, কেমব্রিজ, ইউকে)।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসমাইলের মতে, একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়েই পড়াশোনা করুক না কেন, তাকে অবশ্যই ভালো ফলাফল করতে হবে। তবে বর্তমান সময়ে শুধু ভালো ফলাফল বা ডিগ্রি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সময়ানুবর্তিতা এবং নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি এমন কিছু সফট স্কিল অর্জন করতে হবে, যার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব, আচরণ ও মানসিক বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটে। প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, নতুন কিছু শেখা ও করার মানসিকতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা পড়াশোনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সচল ও সফল ক্যারিয়ারের জন্য সফট স্কিল বা কোমল দক্ষতা এবং হার্ড স্কিল বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা—উভয়ই অর্জন করা জরুরি বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ। তাঁর মতে, যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সময় ব্যবস্থাপনা, মানসিক চাপ মোকাবিলা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, অভিযোজনযোগ্যতা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলা এবং নেটওয়ার্কিংয়ের মতো সফট স্কিল যেমন প্রয়োজন, তেমনই নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সহজে পরিমাপযোগ্য হার্ড স্কিলও অর্জন করতে হবে। হার্ড স্কিল মূলত জ্ঞান ও কাজভিত্তিক দক্ষতা, যেমন—গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নসহ নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি দক্ষতা, ভাষাগত দক্ষতা এবং প্রোগ্রামিং।
বর্তমান চাকরির বাজারে চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতার বিষয়ে ড. ইসমাইল জানান, হার্ড স্কিলের পাশাপাশি বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিসিস, ডিজিটাল মার্কেটিং, সাইবার সিকিউরিটি এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো দক্ষতার চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। ভালো একাডেমিক ফলাফলের সঙ্গে যদি এআই কিংবা সাইবার সিকিউরিটির মতো জ্ঞান যুক্ত হয় এবং প্রয়োজনীয় সফট স্কিল থাকে, তবে চাকরির বাজারে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। শিক্ষার্থীরা সরাসরি বিভিন্ন কোর্সে অংশ নিয়ে কিংবা বিশ্বমানের ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম থেকে বিনা মূল্যে বা কম খরচে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সার্টিফিকেট অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার মাধ্যমে ছোটখাটো প্রজেক্ট বা ফ্রিল্যান্স কাজের অভিজ্ঞতাও অর্জন করা সম্ভব।
তরুণদের ক্যারিয়ার নিয়ে দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বয়সে এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা খুবই স্বাভাবিক। সঠিক ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা, শক্তি, আগ্রহ, কাজের প্রতি ভালো লাগা, ভবিষ্যৎ চাহিদা ও সম্ভাবনা, সামাজিক সুরক্ষা, মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্ব বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তবে মানুষ যা চায় তা সবসময় অর্জন করতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীদের প্ল্যান-এ, প্ল্যান-বি এবং প্রয়োজনে প্ল্যান-সি মাথায় রেখেই ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজজীবন থেকেই ক্যারিয়ার প্রস্তুতি শুরু করার কার্যকর উপায় হিসেবে ড. ইসমাইল লক্ষ্য নির্ধারণ, দক্ষতা অর্জন, ইন্টার্নশিপ এবং পেশাদার যোগাযোগ বা নেটওয়ার্কিং গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তিনি জানান, সঠিক লক্ষ্য ঠিক করতে পারলে কাজের অর্ধেক সম্পন্ন হয়ে যায়। এরপর সেই লক্ষ্য অর্জনে নিয়মিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। শিক্ষকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা, সিনিয়র ও জুনিয়র শিক্ষার্থী এবং পেশাজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কানেক্টিভিটি তৈরি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, পার্টটাইম কাজ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম বা বিভিন্ন প্রজেক্টে যুক্ত হলে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, সময় ব্যবস্থাপনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়।
যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতাকে ক্যারিয়ারের তিনটি মূল দক্ষতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঠিক যোগাযোগ কর্মক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি কমায় এবং কাজের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করে। অন্যদিকে কঠিন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সংকটের সময় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার মতো নেতৃত্বের গুণাবলি সাফল্যের সিঁড়ি তৈরি করে। এছাড়া সবার মতামতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের অহংকার একপাশে রেখে দলের লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা একজন কর্মীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যারিয়ারের শুরুতে ব্যর্থতা বা প্রত্যাশিত চাকরি না পাওয়ার বিষয়ে ড. ইসমাইল তরুণদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যর্থতাই জীবনের শেষ নয়। প্রথমে নিজের ঘাটতিগুলো খুঁজে বের করে আত্মমূল্যায়ন করতে হবে। কোথায় দুর্বলতা রয়েছে এবং কেন প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি, তা বিশ্লেষণ করে বাজার-উপযোগী নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বিনোদন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে এবং সময়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। প্রযুক্তিকে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া যাবে না, বরং প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। দ্রুত উন্নতি করতে গিয়ে পরিস্থিতি না বুঝে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ নেওয়া, দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা অর্জনে গাফিলতি করা এবং পেশাদার যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি না করার মতো ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। রাতারাতি বড় কিছু হওয়ার চেষ্টা না করে ধৈর্য ধরে নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়ানোই ক্যারিয়ারে সফলতার মূল চাবিকাঠি।
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ১৩আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ২২





























