ব্রাজিলের নির্বাচনে বলসোনারোর ছেলেকে সমর্থন নেতানিয়াহুর
- আপডেট সময় : ০৯:৪৩:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান একাকীত্বের মুখে ব্রাজিলের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্রাজিলের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। তেল আবিবের পক্ষ থেকে ফ্লাভিওর সম্ভাব্য জয়কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাও পাওলোতে আয়োজিত এক নির্বাচনী প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহুর একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। সেখানে তিনি ফ্লাভিওকে নিজের ‘বন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করেন এবং দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের সমর্থক হিসেবে তার প্রশংসা করেন। ফ্লাভিও নিজেও ক্ষমতায় আসার পর ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ব্রাজিলের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েলকেন্দ্রিক ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’-এ যোগ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীর অংশ হিসেবে দেখার একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তার রয়েছে।
সাও পাওলোর ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব উবেরল্যান্ডিয়ার অধ্যাপক ডেভিড ম্যাগালহায়েস মনে করেন, ফ্লাভিওর এই জয় নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক সুবিধা বয়ে আনবে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে এবং বিশ্বজুড়ে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে, তখন ব্রাজিলের মতো একটি প্রভাবশালী দেশের সমর্থন ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
তবে ব্রাজিলে ইসরায়েলি প্রভাবের ইতিহাস কেবল বলসোনারো পরিবারের হাত ধরে শুরু হয়নি। দেশটির সামরিক বাহিনী, পুলিশ, প্রতিরক্ষা খাত এবং শক্তিশালী ইভানজেলিক্যাল রাজনীতির সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। ২০০০-এর দশকের শুরু থেকেই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্রাজিলের সামরিক খাতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। গবেষকদের মতে, বলসোনারো এই সম্পর্কের সূচনা না করলেও আগের বিদ্যমান কাঠামোকে আরও সুদৃঢ় করেছেন, যার ফলে যেকোনো নতুন সরকারের পক্ষে এই সামরিক ও প্রযুক্তিগত নির্ভরতা হুট করে ছিন্ন করা বেশ কঠিন।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলার নেতৃত্বাধীন সরকার অবশ্য ইসরায়েলের ব্যাপারে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। লুলা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ এবং ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মামলায়ও ব্রাজিল অংশ নিয়েছে এবং ২০২৪ সালে তেল আবিব থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছে লুলা সরকার। তবে এত কিছুর পরও সামরিক সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। ২০২৪ সালে ব্রাজিলের সামরিক বাহিনী ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এলবিটের সঙ্গে ২১ কোটি ডলারের একটি অস্ত্রচুক্তি সম্পন্ন করলে লুলা তা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন, কিন্তু পুরোপুরি বাতিল করেননি।
ইসরায়েলের সঙ্গে বলসোনারো পরিবারের গভীর সম্পর্কের আরেকটি চিত্র দেখা যায় জইর বলসোনারোর অন্য ছেলে এদুয়ার্দো বলসোনারোর কর্মকাণ্ডে। ২০২৫ সালে ব্রাজিলে এক ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হলে এদুয়ার্দো সরাসরি ইসরায়েলি মন্ত্রী আমিচাই চিকলির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তদন্ত বন্ধের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে এই তদন্ত প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি নিজেই দাবি করেছিলেন।
ব্রাজিলের পার্লামেন্টেও ইসরায়েলপন্থীদের একটি শক্তিশালী বলয় রয়েছে। সামরিকপন্থী ‘বুলেট’, কৃষি ও পশুপালন খাতের ‘বিফ’ এবং ইভানজেলিক্যালদের ‘বাইবেল’—এই তিন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত ‘থ্রি বি’ জোটের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি গভীর সমর্থন রয়েছে। দেশটিতে প্রায় চার কোটি ইভানজেলিক্যাল ভোটার রয়েছেন যারা এই রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখেন। তবে সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেলিসিয়ানো দে সা গিমারায়েসের মতে, আসন্ন নির্বাচনে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট প্রধান ইস্যু নয়। ব্রাজিলের সাধারণ ভোটারদের কাছে কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক এই ইস্যুটি ভোটারদের রাজনৈতিক আনুগত্যকে আরও দৃঢ় করতে পারে।
এদিকে পিউ রিসার্চের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রাজিলের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের মনে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে এবং ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ নেতানিয়াহুর ওপর আস্থা রাখেন না। ফলে ব্রাজিলের এই নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং দেশটির ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ নির্ধারণের এক বড় পরীক্ষা। লুলার কড়া সমালোচনামূলক অবস্থানের বিপরীতে ফ্লাভিও বলসোনারোর এই প্রকাশ্য ইসরায়েলপন্থী প্রতিশ্রুতিই তেল আবিবকে ব্রাজিলের নির্বাচনের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করছে।




























