ঢাকা ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আলতাফ মাহমুদ বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন হবেই’

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৪:১৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম ও অমানবিক নির্যাতনের মুখে দাঁড়িয়েও একবিন্দু মনোবল হারাননি শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদ। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সহযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন, বুকে ধারণ করেছেন স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আলতাফ মাহমুদের শেষ দিনগুলোর এমনই এক বীরত্বপূর্ণ ও লোমহর্ষক চিত্র তুলে ধরেছেন বন্দিশালা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা তাঁর সহযোদ্ধারা।

‘স্মৃতি ৭১’ নামের সংগঠনের উদ্যোগে ‘শহীদ আলতাফ মাহমুদের মুক্তিযুদ্ধ এবং তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধার বিস্ময়করভাবে বেঁচে ফেরার গল্প’ শীর্ষক এই স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আলতাফ মাহমুদের শেষ দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেন তাঁর শ্যালক ও সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল আলম বিল্লাহ (খনু বিল্লাহ)। তিনি বলেন, বেয়োনেটের আঘাতে আলতাফ মাহমুদের কপালের চামড়া কেটে ঝুলে পড়েছিল এবং রাইফেলের বাঁটের আঘাতে মুখের এক পাশ মারাত্মকভাবে জখম হয়েছিল। একটি চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়া ও সারা শরীরে আঘাতের কারণে তিনি ঠিকমতো বসতেও পারতেন না। এমন অবস্থায় খায়রুল আলমের কাঁধে মাথা রেখে আলতাফ মাহমুদ বলেছিলেন, “আমাকে ওরা ছাড়বে না। আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমাদের দেশ অবশ্যই স্বাধীন হবে।”

খায়রুল আলম বিল্লাহ ও তাঁর ভাই লিনু বিল্লাহ হলেন আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারাহ আরা মাহমুদের ভাই। ১৯৭১ সালের ১০ আগস্ট সকালে তাঁদের বাড়ি ঘেরাও করে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় আলতাফ মাহমুদসহ তাঁদেরও তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্যরা। লিনু বিল্লাহ স্মরণ করেন, নির্যাতনের সময় আলতাফ মাহমুদ হানাদারদের বলেছিলেন, “অস্ত্র আমি রেখেছি। ওরা কিছু জানে না। ওদের ছেড়ে দিন।” এই স্বীকারোক্তির পর তিন দিন বাদে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হলেও আলতাফ মাহমুদ আর কখনো ফিরে আসেননি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি সহযোদ্ধাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যতই নির্যাতন করা হোক না কেন, কেউ যেন কারও নাম প্রকাশ না করে।

অনুষ্ঠানে আরও স্মৃতিচারণা করেন একই দিনে আটক হওয়া শিল্পী অধ্যাপক আবুল বার্‌ক্‌ আলভী ও ব্যাংকার নাসের বখতিয়ার। আবুল বার্‌ক্‌ আলভী রণাঙ্গন থেকে ঢাকায় এসে আলতাফ মাহমুদের বাসায় রাত কাটানোর পরদিন সকালে ধরা পড়েন। তিনি ছবি আঁকেন জানার পর পাকিস্তানি সেনারা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তাঁর দুই হাত থেঁতলে দেয় এবং আঙুলের নখ উপড়ে ফেলে। নাসের বখতিয়ার জানান, বন্দিদের উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো, লাথি মারা এবং শরীরে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরার মতো ভয়াবহ নির্যাতন করা হতো। আলতাফ মাহমুদকে উর্দুতে প্রশ্ন করা হলে তিনি সবসময় বাংলায় উত্তর দিতেন; তাঁর মুখ থেকে একটি উর্দু শব্দও বের করতে পারেনি পাকিস্তানি সেনারা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী দেশের অভ্যন্তরে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করা সাধারণ মানুষ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ, যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন আলতাফ মাহমুদ।

আয়োজক সংগঠন ‘স্মৃতি ৭১’-এর পক্ষে ফারুক এইচ খান জানান, মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তিত্বদের অবদান তুলে ধরতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁদের এ ধরনের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে তাঁরা অপারেশন জ্যাকপট ও যশোর রোড নিয়ে অনুষ্ঠান করেছেন।

স্মরণসভার শুরুতে অভিনেতা আফজাল হোসেন নির্মিত ‘হৃদয়ে একাত্তর’ নামের একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়, যা আলতাফ মাহমুদ ও তাঁর সহযোদ্ধাদের আটকের ঘটনা নিয়ে তৈরি। এরপর রুশো রকিবের রচনা ও নির্দেশনায় বন্দিশালার নির্যাতনের ওপর ভিত্তি করে একটি নাটক পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে বেঁচে ফেরা চার বীর মুক্তিযোদ্ধাকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। মাহবুব জামানের সঞ্চালনায় এই স্মৃতিচারণ পর্বের পর অলকা ফওজিয়া, শর্মিলা জুলি ও লিনু বিল্লাহর কণ্ঠে শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুর করা গান পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আলতাফ মাহমুদ বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন হবেই’

আপডেট সময় : ০৪:১৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম ও অমানবিক নির্যাতনের মুখে দাঁড়িয়েও একবিন্দু মনোবল হারাননি শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদ। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সহযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন, বুকে ধারণ করেছেন স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আলতাফ মাহমুদের শেষ দিনগুলোর এমনই এক বীরত্বপূর্ণ ও লোমহর্ষক চিত্র তুলে ধরেছেন বন্দিশালা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা তাঁর সহযোদ্ধারা।

‘স্মৃতি ৭১’ নামের সংগঠনের উদ্যোগে ‘শহীদ আলতাফ মাহমুদের মুক্তিযুদ্ধ এবং তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধার বিস্ময়করভাবে বেঁচে ফেরার গল্প’ শীর্ষক এই স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আলতাফ মাহমুদের শেষ দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেন তাঁর শ্যালক ও সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল আলম বিল্লাহ (খনু বিল্লাহ)। তিনি বলেন, বেয়োনেটের আঘাতে আলতাফ মাহমুদের কপালের চামড়া কেটে ঝুলে পড়েছিল এবং রাইফেলের বাঁটের আঘাতে মুখের এক পাশ মারাত্মকভাবে জখম হয়েছিল। একটি চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়া ও সারা শরীরে আঘাতের কারণে তিনি ঠিকমতো বসতেও পারতেন না। এমন অবস্থায় খায়রুল আলমের কাঁধে মাথা রেখে আলতাফ মাহমুদ বলেছিলেন, “আমাকে ওরা ছাড়বে না। আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমাদের দেশ অবশ্যই স্বাধীন হবে।”

খায়রুল আলম বিল্লাহ ও তাঁর ভাই লিনু বিল্লাহ হলেন আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারাহ আরা মাহমুদের ভাই। ১৯৭১ সালের ১০ আগস্ট সকালে তাঁদের বাড়ি ঘেরাও করে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় আলতাফ মাহমুদসহ তাঁদেরও তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্যরা। লিনু বিল্লাহ স্মরণ করেন, নির্যাতনের সময় আলতাফ মাহমুদ হানাদারদের বলেছিলেন, “অস্ত্র আমি রেখেছি। ওরা কিছু জানে না। ওদের ছেড়ে দিন।” এই স্বীকারোক্তির পর তিন দিন বাদে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হলেও আলতাফ মাহমুদ আর কখনো ফিরে আসেননি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি সহযোদ্ধাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যতই নির্যাতন করা হোক না কেন, কেউ যেন কারও নাম প্রকাশ না করে।

অনুষ্ঠানে আরও স্মৃতিচারণা করেন একই দিনে আটক হওয়া শিল্পী অধ্যাপক আবুল বার্‌ক্‌ আলভী ও ব্যাংকার নাসের বখতিয়ার। আবুল বার্‌ক্‌ আলভী রণাঙ্গন থেকে ঢাকায় এসে আলতাফ মাহমুদের বাসায় রাত কাটানোর পরদিন সকালে ধরা পড়েন। তিনি ছবি আঁকেন জানার পর পাকিস্তানি সেনারা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তাঁর দুই হাত থেঁতলে দেয় এবং আঙুলের নখ উপড়ে ফেলে। নাসের বখতিয়ার জানান, বন্দিদের উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো, লাথি মারা এবং শরীরে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরার মতো ভয়াবহ নির্যাতন করা হতো। আলতাফ মাহমুদকে উর্দুতে প্রশ্ন করা হলে তিনি সবসময় বাংলায় উত্তর দিতেন; তাঁর মুখ থেকে একটি উর্দু শব্দও বের করতে পারেনি পাকিস্তানি সেনারা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী দেশের অভ্যন্তরে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করা সাধারণ মানুষ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ, যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন আলতাফ মাহমুদ।

আয়োজক সংগঠন ‘স্মৃতি ৭১’-এর পক্ষে ফারুক এইচ খান জানান, মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তিত্বদের অবদান তুলে ধরতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁদের এ ধরনের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে তাঁরা অপারেশন জ্যাকপট ও যশোর রোড নিয়ে অনুষ্ঠান করেছেন।

স্মরণসভার শুরুতে অভিনেতা আফজাল হোসেন নির্মিত ‘হৃদয়ে একাত্তর’ নামের একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়, যা আলতাফ মাহমুদ ও তাঁর সহযোদ্ধাদের আটকের ঘটনা নিয়ে তৈরি। এরপর রুশো রকিবের রচনা ও নির্দেশনায় বন্দিশালার নির্যাতনের ওপর ভিত্তি করে একটি নাটক পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে বেঁচে ফেরা চার বীর মুক্তিযোদ্ধাকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। মাহবুব জামানের সঞ্চালনায় এই স্মৃতিচারণ পর্বের পর অলকা ফওজিয়া, শর্মিলা জুলি ও লিনু বিল্লাহর কণ্ঠে শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুর করা গান পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo