ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ ব্যর্থ: চাঁদাবাজি ও ভুল পরিকল্পনায় জিম্মি সড়ক
- আপডেট সময় : ০৩:১৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় কোনো অবস্থাতেই শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। নৈরাজ্য, ভাঙাচোরা আর জোড়াতালি দেওয়া যানবাহন নিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কে চাঁদাবাজি, পরিবহন মালিকদের দৌরাত্ম্য এবং সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্তের সমন্বয়হীনতাই এর প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন একই সঙ্গে চলাচল করায় ঢাকার সড়কগুলো এখন এক ভুতুড়ে রূপ নিয়েছে। প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৪ সালে ঢাকার ২০ বছরের পরিবহন পরিকল্পনায় ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ বা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালুর সুপারিশ করা হয়েছিল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও ২০১৭ সালের ৩০শে নভেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর তা থমকে যায়। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই প্রকল্প আজও আলোর মুখ দেখেনি।
গত বছর বাস রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা পর্যন্ত বাস চালুর পরিকল্পনা করা হলেও স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী বিএনপি ও এর অঙ্গসংঠনের নাম ব্যবহার করে চাঁদা দাবি করতে থাকে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যের কারণে শেষ পর্যন্ত ওই রুটে বাস চালানো সম্ভব হয়নি এবং সরকার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। একই পরিস্থিতি গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ রুটের ঢাকা নগর পরিবহনের ক্ষেত্রেও। সেখানে চাঁদাবাজদের সঙ্গে সমঝোতা করে বাস চালাতে হচ্ছে। শুরুতে এই রুটে বোরাক-আশিয়ান পরিবহনের বাস চালানো হলেও এক মাসে ২১ লাখ টাকা লোকসান দিয়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৫ সালে নতুন করে শুধু গুলিস্তান থেকে চাষাড়া রুটে বাস চালানো হচ্ছে।
বোরাক-আশিয়ান পরিবহনের পরিচালক আজিজুল আনসারী জানান, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কাউন্টার না দেওয়ায় তাদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী নিতে হতো। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ অন্য গাড়ি ৪-৫ মিনিট দাঁড়াতে দিলেও তাদের গাড়ি ১ মিনিট দাঁড়াতেই সরিয়ে দিত। এই অসহযোগিতার কারণে যাত্রী নিতে না পেরে লোকসান হওয়ায় তারা গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেন। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও এই রুটে চাঁদা দিয়ে বাস চালাতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে অংশীদার প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক সভায় সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম উপস্থিত ছিলেন। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকায় ব্যক্তি বা একক মালিকানায় আলাদা বাস চলতে দেওয়া হবে না। বাস চলবে নির্দিষ্ট কোম্পানির চুক্তির অধীনে এবং আইন অমান্য বা ফিটনেসবিহীন বাসের দায় কোম্পানিকেই নিতে হবে।
ঢাকার পরিবহন খাতের সংস্কারে সরকার সবসময়ই মালিকদের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৩ সালের মে মাসে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও পরিবহন নেতাদের ধর্মঘট ও আন্দোলনের মুখে সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করা যায়নি। গত বছর ২০ বছরের পুরনো বাস-মিনিবাস ও ২৫ বছরের পুরনো ট্রাক সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিলে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ বাণিজ্যিক গাড়ির আয়ুষ্কাল ৩০ বছর করাসহ ৮ দফা দাবি জানায়। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেয়।
অন্যদিকে যানজট কমাতে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নেওয়া বিআরটি প্রকল্প একটি বড় ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। ১৪ বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর জানা গেছে, বিশেষ লেনে বাস চালানোর উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না, বরং এটি সাধারণ যানবাহনের জন্য চার লেনের সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা জনভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার বড় বাস টার্মিনালগুলোকে শহরের বাইরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মহাখালী টার্মিনাল পূর্বাচলে, সায়েদাবাদ কাঁচপুরে এবং গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে সরানোর নির্দেশ দেন। ইতিমধ্যে মহাখালীর অলস বাসগুলো পূর্বাচলে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ জানান, আগামী তিন মাসের মধ্যে গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার টার্মিনাল কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় ঝিলমিল প্রজেক্টের ১০ একর জায়গায় স্থানান্তর করা হবে, যেখানে ডিপো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিবহন নেতারা অত্যন্ত ক্ষমতাবান। সরকার পরিবর্তনে শুধু হাতবদল হয়। তারা ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় দলের সঙ্গেই যুক্ত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ রয়েছে। তারা ধর্মঘট ডেকে রাষ্ট্র ও জনগণকে জিম্মি করে অনৈতিক দাবি আদায় করে নেয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদূর রহমান বলেন, মেট্রোরেল বা সাবওয়ের পেছনে ২ লাখ কোটি টাকা খরচ না করে মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ৪ হাজার নতুন বাস কিনে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করলে ঢাকার যানজট ৬০% কমে যেত। কিন্তু দুর্নীতি করার সুযোগ থাকবে না বলেই সরকার এই প্রকল্প নেয় না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, সরকারের ভুল পরিকল্পনার কারণেই ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরছে না। মেট্রোরেলের মতো জটিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলেও বাস মালিকদের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবে সহজ ও কম খরচের বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং বা বিআরটি সফল করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা না আসার কারণ সরকারের ভুল পরিকল্পনা। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ঢাকার মতো মেগাসিটিতে গণপরিবহনের সংকট সমাধানে ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় সহজ ও কম খরচের কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সব বাস মালিককে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় এনে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং, মানসম্মত বাস সার্ভিস চালু এবং প্রয়োজনীয় জায়গায় বিআরটি লেন চালু করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সরকার বাস সার্ভিসের মান উন্নয়ন, কার্যকর বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং এবং বিআরটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ফ্র্যাঞ্চাইজিংয়ের নামে বছরের পর বছর উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সরকার ও বাস মালিকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ মেট্রোরেলের মতো বড় ও জটিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।


























