হরমুজের বিকল্প হিসেবে আর্কটিকের ‘বরফ সিল্ক রোড’ কতটা কার্যকর?
- আপডেট সময় : ০৮:০৯:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলো যখন আঞ্চলিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় বারবার ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তখন বিকল্প পথ হিসেবে আর্কটিকের উত্তর সাগরপথ বা নর্দার্ন সি রুট নিয়ে চীনের আগ্রহ বাড়ছে। দেশটি ইতোমধ্যে এই পথে নিয়মিত বাণিজ্যিক কনটেইনার পরিবহন শুরু করেছে। যদিও চীন-ইউরোপ বাণিজ্যে সময় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও পরিবেশগত ঝুঁকি, রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা, নিষেধাজ্ঞা এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে এই ‘বরফ সিল্ক রোড’ কতটা বাস্তবসম্মত বিকল্প হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে প্রায় ৫,৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এই নর্দার্ন সি রুটটি আর্কটিক মহাসাগরের বরফাচ্ছাদিত জলপথ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীষ্মকালীন সমুদ্রবরফ দ্রুত গলে যাওয়ায় পথটি নৌচলাচলের জন্য আগের চেয়ে বেশি উন্মুক্ত হচ্ছে। সম্প্রতি চীনা শিপিং কোম্পানি সি লিজেন্ড এই পথে নিয়মিত কনটেইনার সার্ভিস চালু করেছে। ২০২৫ সালে একটি পরীক্ষামূলক যাত্রার পর, এবার তারা চীনের নিংবো-ঝৌশান বন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো পর্যন্ত সরাসরি পণ্য পরিবহন করছে। কোম্পানিটির দাবি, এই যাত্রায় সময় লাগতে পারে মাত্র ১৮ দিন, যেখানে সুয়েজ খাল দিয়ে একই পথ পাড়ি দিতে ৪০ দিনের বেশি সময় প্রয়োজন হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট পণ্যের মতো তাপমাত্রা-সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনে এই রুট বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ‘পোলার সিল্ক রোড’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় মস্কোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নির্ভরতা বেইজিংমুখী হওয়ায় আর্কটিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব ও প্রবেশাধিকার আরও বেড়েছে। নর্দার্ন সি রুটের বড় অংশ রাশিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ায় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটম এর পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পরিবেশগত দিক থেকে এই রুটটি বেশ বিতর্কিত। যদিও সি লিজেন্ডের দাবি, পথ ছোট হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব, তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারী জ্বালানি তেল বা হেভি ফুয়েল অয়েলের ব্যবহার আর্কটিকের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই জ্বালানি ঘন হওয়ায় প্রচণ্ড ঠান্ডায় পরিষ্কার করা অসম্ভব এবং দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে। এছাড়া ভারী জ্বালানি পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন ‘ব্ল্যাক কার্বন’ আর্কটিকের বরফ গলার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে, যা এক গভীর বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও এই রুটের বড় বাধা। বেলোনার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রায় ১০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করেছে, যা ওই বছর রুটটিতে চলা কার্গো জাহাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এ ছাড়া রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌবহর এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত ট্যাংকারগুলোর যথাযথ বীমা বা নিয়ন্ত্রক তদারকি নেই। সাম্প্রতিক সময়ে রুশ এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ এবং ৮০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী রুশ জাহাজের অস্বাভাবিক বহর উত্তর মেরুর ৫০০ মাইলের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করতে দেখা গেছে। সামগ্রিক বিবেচনায়, নর্দার্ন সি রুট ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি সংযোজন হতে পারে, তবে আপাতত এটিকে হরমুজ প্রণালি বা সুয়েজ খালের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে দেখার সময় এখনো আসেনি।
আর্কটিকে জাহাজ চলাচলে ভারী জ্বালানি তেল বা হেভি ফুয়েল অয়েল ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষ উদ্বেগের কারণ। ২০২৪ সালে আর্কটিক অঞ্চলে এই জ্বালানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও কিছু জাহাজের এ ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের কারণে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।




























