ঢাকা ০২:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
২৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তন, থাকবেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: রশিদুজ্জামান মিল্লাত বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ১০০ শিক্ষককে জাতীয় সম্মাননা দিলেন প্রধানমন্ত্রী দেশের ৪০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর সেবা চালু চলনবিলে দেশি মাছের আকাল, সংকটে শুঁটকি চাতাল নওগাঁয় অ্যাম্বুলেন্সের ধাক্কায় ভ্যানচালক নিহত, যাত্রী গুরুতর আহত আগামী ২৯শে নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ডাক দিলেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী স্যানচেজ চট্টগ্রামে বাসের ধাক্কায় আহত পুলিশ সদস্য আল আমিনের মৃত্যু সুস্থ হয়ে আরব আমিরাতের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ছেন শান্ত পাটকাঠি থেকে চারকোল উৎপাদন: খুলছে আড়াই হাজার কোটি টাকার রফতানি সম্ভাবনা

পাটকাঠি থেকে চারকোল উৎপাদন: খুলছে আড়াই হাজার কোটি টাকার রফতানি সম্ভাবনা

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০২:০৫:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



প্রবাদে ছাইয়ের ভেতর মানিক রতনের খোঁজ পাওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা যেন এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে পাটকাঠির ক্ষেত্রে। এক সময়ের সাধারণ লাকড়ি বা বেড়া দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত পাটখড়ি এখন আর অবহেলিত কোনো উপাদান নয়। পাটকাঠির এই ছাই বা চারকোল এখন বিশ্ববাজারে ‘কালোহীরক’ বা হীরার পাউডার হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। ক্রমাগত লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের বহু পাটকল সরকারি নানামুখী প্রণোদনা ও তৎপরতায় আবারও সচল হয়েছে। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পণ্যের কদর বাড়ায় পাটের পাশাপাশি এর বহুমুখী ব্যবহারের গুরুত্বও বাড়ছে। পাট থেকে পলিথিন ও পাট পাতার চায়ের মতো নতুন উদ্ভাবনের পর এবার পাটকাঠি থেকে অ্যাকটিভেটেড চারকোল উৎপাদন দেশের পাটশিল্পের চেহারা বদলে দেওয়ার এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

ক্লিভল্যান্ডভিত্তিক বিশ্বখ্যাত শিল্প বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডোনিয়া গ্রুপ ইনকরপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর চারকোলের চাহিদা গড়ে ৮ দশমিক ১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাট অধিদফতরের হিসাব মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টন পাটখড়ি উৎপাদিত হয়। এর মাত্র অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ পাটকাঠিও যদি চারকোল তৈরিতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়, তবে দেশে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন চারকোল উৎপাদন করা যাবে। এই পরিমাণ চারকোল বিদেশে রফতানি করে বছরে প্রায় ৩২ কোটি ২৫ লাখ ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। একই সঙ্গে এ খাত থেকে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এই উদীয়মান শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে ২০ হাজার এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষের বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

কৃষকদের মতে, বাজারে পাট বিক্রি করে অনেক সময় উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে। তবে পাটকাঠি বিক্রির পুরো টাকাটাই কৃষকদের জন্য নিট লাভ হিসেবে থাকে। বর্তমানে অনেকেই পাটকাঠি কেনাবেচাকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়েছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশে প্রথম ওয়াং ফেই নামের এক চীনা নাগরিক পাটকাঠি পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে তা রফতানির পথ দেখান। এরপর থেকেই দেশে বাণিজ্যিকভাবে অ্যাকটিভেটেড চারকোল উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে চীনের পাশাপাশি তাইওয়ান, জাপান, হংকং ও ব্রাজিলেও এই চারকোল রফতানি করা হচ্ছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাটখড়ির চারকোল রফতানি করে ৫৪ কোটি টাকা আয় করেছিল। বাংলাদেশ চারকোল উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতির মতে, বর্তমানে এ খাত থেকে বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা, যা অচিরেই ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চীন, মেক্সিকো, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, ব্রাজিল, তাইওয়ান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জার্মানি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই চারকোলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের ওয়াটার পিউরিফিকেশন বা পানি শোধন প্ল্যান্টগুলোতে এই চারকোল প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়।

এই সম্ভাবনাময় খাতকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। তারা চারকোল খাতকে একটি উদীয়মান শিল্প হিসেবে ঘোষণা করার দাবি তুলেছেন। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র সহজ করা, পাটজাত পণ্য হিসেবে ২০ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ বা নগদ সহায়তা প্রদান এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। এই শিল্পের দ্রুত বিকাশের জন্য একটি পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অতীতে পাটকাঠি কেবল রান্নার জ্বালানি, ঘরের বেড়া, পানের বরজ কিংবা আখের ছোবড়ার সঙ্গে মিশিয়ে পার্টিকেল বোর্ড তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে বিশেষ চুল্লিতে পাটকাঠি পুড়িয়ে কার্বন বা চারকোল তৈরির প্রযুক্তি এই খাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ চুল্লিতে পাটকাঠি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পোড়ানোর পর চুল্লির মুখ এমনভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় যেন ভেতরে অক্সিজেন প্রবেশ করতে না পারে। এভাবে চার দিন রেখে দেওয়ার পর তা ক্রাশিং বা গুঁড়ো করে প্যাকেটজাত করে রফতানি করা হয়। বর্তমানে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০টির মতো চারকোল কারখানা গড়ে উঠেছে। জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গাজীপুর জেলায় এসব কারখানা অবস্থিত। এগুলোর মধ্যে সানবিম কর্পোরেশন, মাহফুজা অ্যান্ড আহান এন্টারপ্রাইজ, জামালপুর চারকোল লিমিটেড ও রিগারো প্রাইভেট লিমিটেড উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দেশে ১০-১২টি প্রতিষ্ঠান বড় পরিসরে কয়লা উৎপাদন করছে। সাধারণত এক মণ চারকোল উৎপাদনে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা খরচ হলেও তা বাজারে ৭৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি করা যায়।

পাটের বহুমুখী ব্যবহারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) পাটের আঁশ থেকে সুতার কাঁচামাল ‘ভিসকস’ তৈরির একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। পরীক্ষামূলকভাবে কিছু ভিসকস উৎপাদনও করা হয়েছে এবং বড় পরিসরে ভিসকস ও চারকোল উৎপাদনের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের (জেডিপিসি) মতে, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারে যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারেন, তবে এই রফতানি আয় আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।

সাধারণ কয়লার সঙ্গে অ্যাকটিভেটেড চারকোলের মূল পার্থক্য হলো এটি তৈরিতে কোনো বিষাক্ত উপাদান ব্যবহৃত হয় না। হাড়, পাটকাঠি, নারকেলের শক্ত খোসা ও জলপাই কাঠ পুড়িয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় অক্সিডাইজড ও ফাঁপিয়ে এটি তৈরি করা হয়। ত্বক সচেতন মানুষের কাছে এটি এখন অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশ্বের নামী ব্র্যান্ডগুলো ফেসওয়াশ, স্ক্র্যাব ও পিল অফ মাস্কের মূল উপাদান হিসেবে এটি ব্যবহার করছে। এছাড়া এটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, কেমিক্যাল ও বিষাক্ত উপাদান দূর করে ত্বক পরিষ্কার করে, রোমকূপ ছোট করে এবং ব্রণের সমস্যা কমায়। এমনকি মিনারেল ওয়াটারের সঙ্গে অ্যাকটিভেটেড চারকোলের পেস্ট বানিয়ে পোকার কামড়ের স্থানে লাগালে দ্রুত বিষ ও জ্বালাপোড়া কমে যায়। বর্তমানে এটি ফার্মেসিতে ট্যাবলেট আকারে এবং ভেষজ দোকানে গুঁড়ো হিসেবেও সহজে কিনতে পাওয়া যায়। (নিবন্ধটি লিখেছেন সাংবাদিক ও কৃষি-অর্থনীতি বিশ্লেষক এস এম মুকুল)।

সাধারণত এক মণ চারকোল উৎপাদনে গড়ে খরচ হয় ৩০-৩৫ টাকা অথচ বিক্রি করা যায় ৭৫-৯০ টাকায়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh

নিউজটি শেয়ার করুন

পাটকাঠি থেকে চারকোল উৎপাদন: খুলছে আড়াই হাজার কোটি টাকার রফতানি সম্ভাবনা

আপডেট সময় : ০২:০৫:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রবাদে ছাইয়ের ভেতর মানিক রতনের খোঁজ পাওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা যেন এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে পাটকাঠির ক্ষেত্রে। এক সময়ের সাধারণ লাকড়ি বা বেড়া দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত পাটখড়ি এখন আর অবহেলিত কোনো উপাদান নয়। পাটকাঠির এই ছাই বা চারকোল এখন বিশ্ববাজারে ‘কালোহীরক’ বা হীরার পাউডার হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। ক্রমাগত লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের বহু পাটকল সরকারি নানামুখী প্রণোদনা ও তৎপরতায় আবারও সচল হয়েছে। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পণ্যের কদর বাড়ায় পাটের পাশাপাশি এর বহুমুখী ব্যবহারের গুরুত্বও বাড়ছে। পাট থেকে পলিথিন ও পাট পাতার চায়ের মতো নতুন উদ্ভাবনের পর এবার পাটকাঠি থেকে অ্যাকটিভেটেড চারকোল উৎপাদন দেশের পাটশিল্পের চেহারা বদলে দেওয়ার এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

ক্লিভল্যান্ডভিত্তিক বিশ্বখ্যাত শিল্প বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডোনিয়া গ্রুপ ইনকরপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর চারকোলের চাহিদা গড়ে ৮ দশমিক ১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাট অধিদফতরের হিসাব মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টন পাটখড়ি উৎপাদিত হয়। এর মাত্র অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ পাটকাঠিও যদি চারকোল তৈরিতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়, তবে দেশে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন চারকোল উৎপাদন করা যাবে। এই পরিমাণ চারকোল বিদেশে রফতানি করে বছরে প্রায় ৩২ কোটি ২৫ লাখ ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। একই সঙ্গে এ খাত থেকে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এই উদীয়মান শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে ২০ হাজার এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষের বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

কৃষকদের মতে, বাজারে পাট বিক্রি করে অনেক সময় উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে। তবে পাটকাঠি বিক্রির পুরো টাকাটাই কৃষকদের জন্য নিট লাভ হিসেবে থাকে। বর্তমানে অনেকেই পাটকাঠি কেনাবেচাকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়েছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশে প্রথম ওয়াং ফেই নামের এক চীনা নাগরিক পাটকাঠি পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে তা রফতানির পথ দেখান। এরপর থেকেই দেশে বাণিজ্যিকভাবে অ্যাকটিভেটেড চারকোল উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে চীনের পাশাপাশি তাইওয়ান, জাপান, হংকং ও ব্রাজিলেও এই চারকোল রফতানি করা হচ্ছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাটখড়ির চারকোল রফতানি করে ৫৪ কোটি টাকা আয় করেছিল। বাংলাদেশ চারকোল উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতির মতে, বর্তমানে এ খাত থেকে বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা, যা অচিরেই ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চীন, মেক্সিকো, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, ব্রাজিল, তাইওয়ান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জার্মানি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই চারকোলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের ওয়াটার পিউরিফিকেশন বা পানি শোধন প্ল্যান্টগুলোতে এই চারকোল প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়।

এই সম্ভাবনাময় খাতকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। তারা চারকোল খাতকে একটি উদীয়মান শিল্প হিসেবে ঘোষণা করার দাবি তুলেছেন। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র সহজ করা, পাটজাত পণ্য হিসেবে ২০ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ বা নগদ সহায়তা প্রদান এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। এই শিল্পের দ্রুত বিকাশের জন্য একটি পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অতীতে পাটকাঠি কেবল রান্নার জ্বালানি, ঘরের বেড়া, পানের বরজ কিংবা আখের ছোবড়ার সঙ্গে মিশিয়ে পার্টিকেল বোর্ড তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে বিশেষ চুল্লিতে পাটকাঠি পুড়িয়ে কার্বন বা চারকোল তৈরির প্রযুক্তি এই খাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ চুল্লিতে পাটকাঠি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পোড়ানোর পর চুল্লির মুখ এমনভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় যেন ভেতরে অক্সিজেন প্রবেশ করতে না পারে। এভাবে চার দিন রেখে দেওয়ার পর তা ক্রাশিং বা গুঁড়ো করে প্যাকেটজাত করে রফতানি করা হয়। বর্তমানে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০টির মতো চারকোল কারখানা গড়ে উঠেছে। জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গাজীপুর জেলায় এসব কারখানা অবস্থিত। এগুলোর মধ্যে সানবিম কর্পোরেশন, মাহফুজা অ্যান্ড আহান এন্টারপ্রাইজ, জামালপুর চারকোল লিমিটেড ও রিগারো প্রাইভেট লিমিটেড উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দেশে ১০-১২টি প্রতিষ্ঠান বড় পরিসরে কয়লা উৎপাদন করছে। সাধারণত এক মণ চারকোল উৎপাদনে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা খরচ হলেও তা বাজারে ৭৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি করা যায়।

পাটের বহুমুখী ব্যবহারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) পাটের আঁশ থেকে সুতার কাঁচামাল ‘ভিসকস’ তৈরির একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। পরীক্ষামূলকভাবে কিছু ভিসকস উৎপাদনও করা হয়েছে এবং বড় পরিসরে ভিসকস ও চারকোল উৎপাদনের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের (জেডিপিসি) মতে, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারে যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারেন, তবে এই রফতানি আয় আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।

সাধারণ কয়লার সঙ্গে অ্যাকটিভেটেড চারকোলের মূল পার্থক্য হলো এটি তৈরিতে কোনো বিষাক্ত উপাদান ব্যবহৃত হয় না। হাড়, পাটকাঠি, নারকেলের শক্ত খোসা ও জলপাই কাঠ পুড়িয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় অক্সিডাইজড ও ফাঁপিয়ে এটি তৈরি করা হয়। ত্বক সচেতন মানুষের কাছে এটি এখন অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশ্বের নামী ব্র্যান্ডগুলো ফেসওয়াশ, স্ক্র্যাব ও পিল অফ মাস্কের মূল উপাদান হিসেবে এটি ব্যবহার করছে। এছাড়া এটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, কেমিক্যাল ও বিষাক্ত উপাদান দূর করে ত্বক পরিষ্কার করে, রোমকূপ ছোট করে এবং ব্রণের সমস্যা কমায়। এমনকি মিনারেল ওয়াটারের সঙ্গে অ্যাকটিভেটেড চারকোলের পেস্ট বানিয়ে পোকার কামড়ের স্থানে লাগালে দ্রুত বিষ ও জ্বালাপোড়া কমে যায়। বর্তমানে এটি ফার্মেসিতে ট্যাবলেট আকারে এবং ভেষজ দোকানে গুঁড়ো হিসেবেও সহজে কিনতে পাওয়া যায়। (নিবন্ধটি লিখেছেন সাংবাদিক ও কৃষি-অর্থনীতি বিশ্লেষক এস এম মুকুল)।

সাধারণত এক মণ চারকোল উৎপাদনে গড়ে খরচ হয় ৩০-৩৫ টাকা অথচ বিক্রি করা যায় ৭৫-৯০ টাকায়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh