জার্মানি থেকে ভারতে ধ্রুব রাঠি: মোদি সরকারের নতুন মাথাব্যথা?
- আপডেট সময় : ০১:৩৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

‘নমস্কার দোস্ত!’—দুই হাতের তালু জোড় করে এই পরিচিত সম্ভাষণে যিনি লাখ লাখ তরুণের মন জয় করেছেন, সেই জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি এখন সরাসরি ভারতের আন্দোলনের মাঠে নেমেছেন। জার্মানি থেকে তাঁর আকস্মিক ভারতে ফিরে আসা এবং চলমান ‘ককরোচ আন্দোলন’-এ যোগ দেওয়া নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি কোনো political দলের নেতা বা সংসদ সদস্য নন, কিন্তু তথ্য ও যুক্তির ধারালো উপস্থাপনা দিয়ে তিনি এখন ভারতের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছেন।
গত ৭ অক্টোবর বুধবার দিবাগত রাতে ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র অভিজিৎ দিপকে একটি ভিডিওর মাধ্যমে ধ্রুব রাঠির জার্মানি থেকে ভারতে ফেরার খবরটি প্রকাশ করেন। ভিডিওতে রাঠিকে একটি চেয়ারে বসা অবস্থায় তাঁর সেই বিখ্যাত সিগনেচার ডায়ালগ ‘নমস্কার দোস্ত!’ দিতে দেখা যায়। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনরা নরেন্দ্র মোদির ‘হাই ফ্রানড্স…!’ এবং রাঠির ‘নমস্কার দোস্ত!’-এর ভিডিও পাশাপাশি জুড়ে দিয়ে তুলনা শুরু করেন যে, তরুণদের কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। পরদিন ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির কর্মসূচিতে রাঠির সশরীরে উপস্থিতি তরুণদের মাঝে রকস্টারের মতো উদ্দীপনা তৈরি করে।
শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোর মতো ভারতের তরুণদের একটি বড় অংশও প্রথাগত রাজনীতিকদের ওপর আস্থা হারিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রচলিত রাজনৈতিক বলয়ের বাইরের কোনো তরুণ যখন যৌক্তিক কথা বলেন, তখন সাধারণ মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দেয়। ভারতের সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ নিয়ে যে আন্দোলন চলছে, তার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ভাবা হচ্ছে রাঠিকে। বিজেপির শাসনামলে তাঁর মতো কট্টর সমালোচক দেশে ফিরতে পারবেন তা অনেকের কল্পনার বাইরে ছিল। ফলে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন আন্দোলনকে আরও গতিশীল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ধ্রুব রাঠির রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে হলে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগের প্রেক্ষাপট মনে রাখা দরকার। সে সময় ভারতের মূলধারার টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমগুলো যখন সরকারের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য দেখিয়ে ‘গোদি মিডিয়া’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছিল, তখন ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাঠির ‘ইজ ইন্ডিয়া বিকামিং আ ডিক্টেটরশিপ?’ শিরোনামের ২৯ মিনিটের ভিডিওটি ব্যাপক আলোড়ন তোলে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিলের মধ্যেই সেটি ২ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ দেখেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও আসামসহ কয়েকটি রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি ভোটার বাদ পড়ার বিষয়ে এবং সর্বশেষ সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে ‘ইটস ডান ব্রো’ শিরোনামে ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি, যা মাত্র ৯ দিনে ২ কোটির বেশিবার দেখা হয়েছে। জটিল রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিষয়গুলোকে সহজ হিন্দিতে তথ্য, ছবি ও গ্রাফিক্সের মাধ্যমে উপস্থাপন করাই তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
শুধু ভারতেই নয়, বাংলাদেশেও ধ্রুব রাঠির বিপুলসংখ্যক দর্শক রয়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ঘনিষ্ঠতার কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়। রাঠি কেবল ভারতের রাজনীতিই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়েও সরাসরি কথা বলেছেন। ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই ‘বাংলাদেশ ইজ বার্নিং!’ শিরোনামে তাঁর ভিডিওটি কোটা সংস্কার আন্দোলন, বেকারত্ব, police-ই দমন-পীড়ন এবং শেখ হাসিনা সরকারের কর্তৃত্ববাদী আচরণের চিত্র আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরেছিল। এরপর ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ‘হোয়াই বাংলাদেশ ইজ হ্যাভিং অ্যান্টি-ইন্ডিয়া প্রোটেস্টস?’ শিরোনামে আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি, যা প্রায় ৮০ লাখ বার দেখা হয়। সেখানে তিনি সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন ও দুই দেশের অসম সম্পর্কের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পরিচিতি পেরিয়ে ধ্রুব রাঠির সরাসরি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া তাঁর অনুসারীদের কাছে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। তাঁর হাতে কোনো রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক ক্ষমতা নেই, কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, যা গণতন্ত্রে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক সারফুদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ধ্রুব রাঠির ‘নমস্কার দোস্ত!’ কেবল একটি সাধারণ সম্ভাষণ নয়, এটি দর্শকের সঙ্গে একটি গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের চুক্তি, যা তাঁকে প্রচলিত অহংকারী রাজনৈতিক বক্তাদের থেকে আলাদা করে তোলে। তাঁর এই উত্থান প্রমাণ করে যে, ভারতের রাজনৈতিক লড়াই এখন শুধু সংসদ বা টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মনোযোগ ও তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার লড়াইয়ে। এই বাক্য ভারতের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তার আভাস শিগগিরই হয়তো মিলবে। সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক। ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com।





























