শিশুর অধিকার রক্ষা ও সুস্থ শৈশব নিশ্চিত করার তাগিদ
- আপডেট সময় : ০২:১৩:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০৭ বার পড়া হয়েছে

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, নেতৃত্বদানকারী এবং সমাজ পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। তাই প্রতিটি শিশুর সুস্থ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা কেবল কোনো একক পরিবারের দায়িত্ব নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও সমগ্র সমাজের একটি বড় নৈতিক দায়িত্ব। শিশুর বেঁচে থাকা, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা লাভ, নিরাপত্তা, মতপ্রকাশ, খেলাধুলা ও বিনোদন এবং বৈষম্যহীনভাবে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সপ্তাহ শুরু হয়। এছাড়া প্রতি বছর ২০শে নভেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দিবস।
শিশুদের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক দলিল হলো ১৯৮৯ সালের ২০শে নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত শিশু অধিকার সনদ (Convention on the Rights of the Child)। এই সনদের মাধ্যমে বিশ্বের দেশগুলো শিশুদের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও বিকাশ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করেছিল। পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ দেশ এই সনদ অনুমোদন করলেও বাস্তব চিত্র এখনো পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বের বহু শিশু এখনো দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নির্যাতন, পাচার, অপুষ্টি, শিক্ষাবঞ্চনা এবং যুদ্ধ-সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চ্যানেল আইতে নিজের কর্মকক্ষের স্মৃতিচারণ করে লেখক জানান, তার রুমে সাজানো ছোট-বড় নানা রঙের পুতুল দেখে অনেকেই শৈশবে ফিরে যান। অনেকে উপহার হিসেবে পুতুল পেয়ে আনন্দিত হন, কারণ মানুষের ভেতরে সবসময়ই একটি শিশু বসবাস করে। অতীতে 'কচিকাঁচার মেলা' করার সোনালি দিনগুলোর সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করে তিনি উল্লেখ করেন, আজকের শিশুরা প্রযুক্তির দিক দিয়ে এগিয়ে থাকলেও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে। খুব সকালে একগাদা বই নিয়ে স্কুলে যাওয়া, বিকেলে coaching আর বাড়ির কাজের চাপে তাদের খেলাধুলার কোনো সময় থাকছে না। শিশু একাডেমিতে নাচ-গান শেখার সুযোগ পাচ্ছে খুব কমসংখ্যক শিশু। মাঠের অভাবে ও খেলাধুলার সুযোগ না পেয়ে বাচ্চারা এখন মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন বিপজ্জনক গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং টিকাদান কর্মসূচির মতো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনো শিশুশ্রম, পথশিশু, বাল্যবিবাহ, অপুষ্টি, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া এবং শিশু নির্যাতনের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো রয়ে গেছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে আশার কথা হলো, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা গুলিস্থান বা রমনা পার্কের মতো জায়গায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, যা অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও ইতিবাচক একটি দিক।
শিশুর অধিকার রক্ষায় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে শিশুর মতামত, অনুভূতি ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শারীরিক বা মানসিক শাস্তির বদলে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রকে প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শিশু নির্যাতন, পাচার, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দিবসের মূল লক্ষ্য কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এমন একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা যেখানে প্রতিটি শিশু মর্যাদা নিয়ে বেড়ে উঠবে এবং কবি কুসুমকুমারী দাশের সেই বিখ্যাত চরণের মতো আমাদের আর বলতে হবে না—‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’।




























