অস্ট্রেলিয়ায় ডেঙ্গুর টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ চালু, বাংলাদেশ কবে পাবে?
- আপডেট সময় : ১১:০০:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

গত ১ অক্টোবর বিকেলে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যায় আট বছর দশ মাস বয়সী শিশু রুমাইসা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া ফুটফুটে এই শিশুটির জ্বর এসেছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। কোনো তীব্র পূর্বলক্ষণ ছাড়াই মাত্র তিন দিনের মাথায় সব শেষ হয়ে যায়। মৃত্যুর দিন সকাল পর্যন্তও স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়া ও খেলাধুলা করেছিল সে। শরীরে কোনো র্যাশ বা রক্তক্ষরণ ছিল না, প্লাটিলেটও ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার। কিন্তু দুপুরে হঠাৎ কাঁপুনি ও খিঁচুনির পর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) ভর্তির মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। রুমাইসার বাবা নিজে একজন নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ হয়েও ডেঙ্গুর এই আকস্মিক ছোবল থেকে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি। তার মা একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ।
এই শোকের আবহেই সিডনি থেকে এসেছে এক আশার খবর। অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে জাপানি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তাকেদার তৈরি কার্যকর ডেঙ্গু টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ (Qdenga)। চার বছর বা তার বেশি বয়সী যে কেউ পারিবারিক চিকিৎসকের (জিপি) ব্যবস্থাপত্র নিয়ে দুই ডোজে এই টিকা নিতে পারছেন। অথচ অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব ভূখণ্ডে ডেঙ্গুর কোনো স্থানীয় বিস্তার নেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে দেশটিতে ২ হাজার ৬৪১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল, যার ৯৪ শতাংশের বেশি বিদেশে গিয়ে সংক্রমিত হয়ে ফিরেছিলেন। অর্থাৎ সেখানে ডেঙ্গু মূলত ভ্রমণকারীদের রোগ। নাগরিকদের আগাম সুরক্ষায় অস্ট্রেলিয়া সরকার ব্যক্তিগত খরচে কেনার শর্তে এই টিকার অনুমোদন দিয়েছে। ফলে সামনে লম্বা ছুটিতে দেশে যাওয়ার আগে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি তাঁদের সন্তানদের এই টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
যেখানে ডেঙ্গুতে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে, সেখানে এই টিকা নেই; অথচ যেখানে রোগটির ঝুঁকি নেই বললেই চলে, সেখানে টিকা মজুত আছে—এই বৈপরীত্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। চলতি বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। সেপ্টেম্বর মাসেই মারা গেছেন বহু মানুষ, আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে হাজারো। ৯ বছরের আরফা জন্মের তিন দিনের মাথায় মাকে হারিয়েছিল, এবার সে ডেঙ্গুতে বাবাকেও হারাল। আর রুমাইসার পাঁচ বছর বয়সী ছোট বোন ফারজিন এখনো বুঝতেই পারছে না তার আপু কোথায় হারিয়ে গেল।
বাংলাদেশে মশা মারার মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগের। কাগজে-কলমে ইউনিয়ন থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ৪৮ হাজার কমিটি থাকার কথা থাকলেও জাতীয় কমিটি আর সিটি করপোরেশনের গুটিকয়েক ছাড়া বাকিগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয়। বহু উপজেলা বা পৌরসভায় ওয়ার্ড কমিটিই নেই। এই প্রশাসনিক ব্যর্থতার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের। রুমাইসার বাবার আক্ষেপ, তাঁদের বাসার পাশেই ময়লার ভাগাড় আর জমে থাকা পানি, যা দেখার কেউ নেই। সিডনির ফার্মেসিতে টিকা সহজলভ্য হলেও ঢাকার হাসপাতালে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যার শয্যা পাওয়া যায় না।
টিকা এলে রাতারাতি সব ঠিক হয়ে যাবে না এবং মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা ও জেলা পর্যায়ে শিশুদের বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। তবে টিকার বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতাও প্রমাণিত। ২০ হাজারের বেশি শিশু-কিশোরের ওপর করা আন্তর্জাতিক ট্রায়ালে দেখা গেছে, কিউডেঙ্গা টিকাটি নিশ্চিত ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে ৮০ শতাংশের বেশি কার্যকর এবং হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি কমায় প্রায় ৯৫ শতাংশ। কিউডেঙ্গার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, আগে কারও ডেঙ্গু না হয়ে থাকলেও সে নিরাপদে এই টিকা নিতে পারে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক দল (SAGE) সুপারিশ করে, ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণ এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের এই টিকা দেওয়া যেতে পারে। ২০২৪ সালের মে মাসে সংস্থাটি কিউডেঙ্গাকে ‘প্রিকোয়ালিফিকেশন’ বা পূর্বযোগ্যতার স্বীকৃতি দেয়, যার ফলে ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন এটি সংগ্রহ করতে পারে। ইতিমধ্যে ৪০টির বেশি দেশে এটি অনুমোদিত হয়েছে। এমনকি প্রতিবেশী ভারতও চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের জন্য কিউডেঙ্গার অনুমোদন দিয়েছে। বিশ্ব এগোলেও বাংলাদেশে কিউডেঙ্গার নিবন্ধন বা নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট বার্তা মেলেনি।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাধারণ শিশুদের সুরক্ষায় সরকারের প্রতি কয়েকটি সুস্পষ্ট প্রস্তাব রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে টিকাটির দ্রুত ও কার্যকর মূল্যায়ন করুক। দ্বিতীয়ত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে শিশু-কিশোর ও ফ্রন্টলাইনারদের জন্য সীমিত পরিসরে হলেও পরীক্ষামূলক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হোক। তৃতীয়ত, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এবং জাতিসংঘের সহায়তা নিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে সরকারিভাবে টিকা আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হোক এবং চতুর্থত, পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রেখে জনসচেতনতা বাড়ানো হোক। মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পাশাপাশি সমান্তরালে এই টিকা আনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।



























